
বহু বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আর্থিক সংযোগ হিসেবে কাজ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকলেও এবার তাতে বড় ধাক্কা এসেছে। ইউএই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও সব ধরনের লেনদেনে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরান শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার হারাবে না, একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথও সংকুচিত হয়ে যাবে।
ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আফরা আল হামেলি জানিয়েছেন, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের চাপও এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পারস্য উপসাগরের ওপারে ইরান থেকে ইউএইর দূরত্ব মাত্র প্রায় ৫০ মাইল। দুই দেশের মধ্যে শত শত বছরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ইউএইতে কয়েক লাখ ইরানি বসবাস করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ইউএই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউএই থেকে এসেছে।
ইলেকট্রনিক পণ্য, মূল্যবান ধাতু ও ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ইউএইর মাধ্যমে ইরানে প্রবেশ করেছে। একইভাবে ইরানের পণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্যও ইউএই। বিশেষ করে খাদ্য ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেশটিতে রপ্তানি করে ইরান।
বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইউএইকে, বিশেষ করে দুবাইকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এড়িয়ে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইরানি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনঃরপ্তানির ক্ষেত্রেও দুবাই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু লেবার বলেন, ‘ইউএইকে ইরানের ফুসফুস বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।’
তবে ইরানের সঙ্গে ইউএইর এই সম্পর্ক নিয়ে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ ও চাপ দিয়ে আসছেন। ইউএইর কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হলে তারা ব্যবস্থা নেন। একই সঙ্গে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউএই সহায়তা করে—এমন অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছেন।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও পারস্পরিক স্বার্থে ইরান ও ইউএই বছরের পর বছর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
অ্যান্ড্রু লেবারের মতে, ইউএইর নতুন নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের বিচ্ছেদ’ তৈরি করবে। তবে ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের উপসাগরীয় অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ রবার্ট মোগিয়েলনিকি মনে করেন, ইউএইর পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত হলেও তা পুরো অর্থনীতিকে ভেঙে দেওয়ার মতো হবে না।
তার মতে, বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলার উপযোগী করে ইরান দীর্ঘদিন ধরে তার অর্থনীতি গড়ে তুলেছে এবং ‘স্বনির্ভরতা’কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে ইউএইর ওপর ইরানের নির্ভরতা যতটা মনে করা হয়, বাস্তবে তা ততটা নয়।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের মিয়াদ মালেকি ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, চলমান যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে ইউএইর নিষেধাজ্ঞা হবে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’। এমনকি এর গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, অঞ্চলের অন্যান্য নৌ অবরোধের সঙ্গে ইউএইর বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় ইরানের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তবে ইউএই সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কঠোরভাবে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ইরানের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইউএই। দেশটি হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে।
ইউএই সরকার বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্তটি ঠিক কখন নেওয়া হয়েছে বা এর পেছনে নির্দিষ্ট কী কারণ রয়েছে, তা বিস্তারিত জানায়নি।
তবে গত সপ্তাহে ইউএই অভিযোগ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তাদের একটি তেলবাহী জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। এরপর ইউএইর ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলেও অভিযোগ করে দেশটি। ইরান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইরানের হামলার পর ইউএই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোট আরও জোরদার করেছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএইর নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
অ্যান্ড্রু লেবারের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন আরব বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ওমান এর অন্যতম উদাহরণ। গত কয়েক দশকে ইরান ও ওমানের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সময়ও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।
তবে ইউএইর তুলনায় অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক সীমিত। রবার্ট মোগিয়েলনিকির মতে, এসব দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত ‘সীমিত ও গুরুত্বহীন’।
তারপরও যুদ্ধ ও ইরানের আঞ্চলিক হামলার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইউএই ও ওমানের অর্থনীতিতে সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে।
আইএমএফের হিসাবে, আগামী পাঁচ বছরে উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট উৎপাদন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।