
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন নৌপথ চালুর বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে আশা করছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তেহরান যেসব কর্মকাণ্ডকে শত্রুতামূলক হিসেবে দেখছে, সেগুলো পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত এই জলপথটি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে না।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) এ কথা জানিয়েছেন ইরানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, প্রস্তাবিত নতুন নৌপথে কোন জাহাজ প্রবেশ করবে এবং কোন জাহাজ বের হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান।
ইরান-ওমানের আলোচনা
হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত এই পথের কিছু অংশ দুই দেশের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেটি আবার চালুর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে রেজাইয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নতুন নৌপথ নিয়ে আলোচনা হলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনই নিশ্চয়তা দিচ্ছে না ইরান।
মার্কিন হামলা বন্ধের শর্ত
মোহসেন রেজাই স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরান যেসব কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ঘাতমূলক বলে বিবেচনা করছে, সেগুলো বন্ধ হলেই কেবল হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা দেবে তেহরান।
তিনি জানান, গত জুনে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকের প্রধান সমস্যা ছিল পর্যাপ্ত গ্যারান্টির অভাব। এমনকি মধ্যস্থতাকারীরাও ওই সমঝোতা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।
সমঝোতা অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের ইরানের ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। বিপরীতে তেহরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
কিন্তু চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই বিরোধের জেরেই সমঝোতাটি ভেঙে যায়।
‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ হরমুজ, দাবি রেজাইয়ের
নতুন নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনা চললেও রেজাই জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ রয়েছে।
তাঁর দাবি, প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে সর্বোচ্চ সাত থেকে আটটি জাহাজ চলাচল করছে। এসব জাহাজের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি ইরানের প্রয়োজনীয় পণ্য বহন করছে।
রেজাই আরও দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী মাঝে মাঝে ওমানের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে কয়েকটি জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই জাহাজগুলো সাধারণত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং অক্ষত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
তাঁর মতে, এ ধরনের সীমিত জাহাজ চলাচলকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এই জলপথ বর্তমানে ঠিক কতটা খোলা রয়েছে, তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তুলে ধরছে।
এর মধ্যেই নতুন নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনা চলছে।
জাহাজ চলাচলে আরও কড়াকড়ির ঘোষণা
রেজাই জানিয়েছেন, ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রণালির আশপাশে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করবে।
ওই এলাকায় প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া এসব জাহাজকে আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না।
রেজাই বলেন, হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ আরও কঠোর করছে ইরান।
তাঁর দাবি, এই জলপথে তেহরানের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবের চেয়েও বেশি হবে।
সংঘাতের মধ্যেই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দাবি
সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রেজাই জানান, ৪৮ ঘণ্টা আগে ইরান প্রথমবারের মতো দেশটিতে তৈরি একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করেছে।
দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রপথে নতুন করে সংঘর্ষের সময়ই তাঁর এই মন্তব্য সামনে এলো।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড শনিবার জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবকে কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন মোহসেন রেজাই।
তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ইরান এখনো তেল বিক্রি করছে এবং রপ্তানি করা তেলের অর্থও পাচ্ছে।
তবে রেজাই এমন এক সময়ে এসব মন্তব্য করেছেন, যখন মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের বন্দরগুলো থেকে তেল রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ইরানের সরকারি রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল প্রধান উৎসই হলো এই তেল রপ্তানি।