-6aae7c3057796 (1).webp)
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে টানা দ্বিতীয় বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মার্কিন সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আব্বাসের সরাসরি উপস্থিতি বাধাগ্রস্ত হবে। শুক্রবার জাতিসংঘের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে মাহমুদ আব্বাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে এবার ভিসা দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে এর ফলে ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে কেবল জাতিসংঘে দেশটির মিশনের সদস্যরা সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারবেন।
‘পূর্ণ অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জাতিসংঘের কার্যক্রমে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নেওয়ার সক্ষমতার ওপর এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গুতেরেস উদ্বিগ্ন।
ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘের কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সব প্রতিনিধিদলের পূর্ণ অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালনের মাধ্যমে সব প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ভিসা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান গুতেরেস আগেও জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তাঁর মুখপাত্র।
এ বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান ডুজারিক।
গত বছরও ভিসা দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন
গত বছরও ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেয়নি। এর ফলে নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশ নেওয়া মাহমুদ আব্বাসকে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের এই বৈশ্বিক ফোরামে বক্তব্য দিতে হয়েছিল।
এবারও আব্বাসকে সরাসরি উপস্থিতির পরিবর্তে অনলাইনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়ে সাধারণ পরিষদে বিপুল সমর্থন পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট পড়ে ১৫২টি, বিপক্ষে মাত্র ৩টি।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক সহায়তা নিয়ে আপত্তি
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের একটি পুরোনো ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ওই ব্যবস্থার আওতায় কারাগারে থাকা কিংবা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। এদের মধ্যে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত ব্যক্তিরাও ছিলেন।
তবে সম্প্রতি এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। সংশোধিত ব্যবস্থায় কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা তিনি কারাগারে ছিলেন কি না—এসব বিষয়কে ভিত্তি না করে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনায় সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবুও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের ভাতা দেওয়া’ অব্যাহত রাখার অভিযোগ তুলেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পাশাপাশি প্রকাশ্য বক্তব্য এবং স্কুলের পাঠ্যবইয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসীদের প্রশংসা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক আদালতে ফিলিস্তিনি উদ্যোগ নিয়েও আপত্তি
ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার ফিলিস্তিনি প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে একতরফাভাবে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা এবং আলোচনার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর একটি উপায়।
জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া ১৪২টি সদস্যরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গেও গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধ রয়েছে।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা
এদিকে মাহমুদ আব্বাসকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ঘটনা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেড়েছে।
১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরাইলের দখলে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর অঞ্চলটিতে সহিংসতা আরও তীব্র হয়। ওই হামলার পরই গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ শুরু হয়।
এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১,১০৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে যোদ্ধা এবং বেসামরিক—দুই শ্রেণির মানুষই রয়েছেন।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলায় ইসরাইলে ১,২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
এরপর গাজা উপত্যকায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৩,৮২১ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও, তাদের প্রকাশ করা হতাহতের পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে জাতিসংঘ।
পশ্চিম তীর নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান
পশ্চিম তীরের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ থাকলেও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নীরব।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে শুধু বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের যেকোনো ধরনের সংযুক্তিকরণের (অ্যানেক্সেশন) বিরোধিতা করে মার্কিন সরকার।