
জাতীয় প্রযুক্তি নিরাপত্তার জন্য কোনো নাগরিককে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে তার বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নতুন বিধি কার্যকর করেছে চীন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির নতুন প্রবেশ ও বহির্গমন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর প্রযুক্তি ও শিল্প খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিদেশযাত্রা আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আসতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলছে বেইজিং
চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন বিধিমালার মূল লক্ষ্য দেশের ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা’। তাদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সীমিত করার উদ্দেশ্য নেই।
বরং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে ভ্রমণ, প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া এবং বিদেশে অবৈধ জুয়া ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নতুন বিধি সহায়ক হবে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
তবে নতুন এই ব্যবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা ও চলাফেরার ক্ষেত্রে চীনা নাগরিকদের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় আগে থেকেই নজরদারি
চীনের সাধারণ নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রা এবং ভ্রমণ পরিকল্পনার ওপর দেশটির কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর নজরদারি করে আসছে।
নতুন বিধিমালার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল গত জুলাইয়ে। সে সময় চীন জানিয়েছিল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের মতো কর্মকাণ্ড দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এসব সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রতিরোধের লক্ষ্যেই নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছিল চীন।
অপরাধে জড়ালে তিন বছর পর্যন্ত বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
নতুন বিধি অনুযায়ী, কোনো চীনা নাগরিক বিদেশে অবস্থানের সময় জাতীয় নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে বেআইনি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে চীনে ফিরে আসেন, তাহলে তার ওপর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে।
শুধু চীনা নাগরিকদের ক্ষেত্রেই নয়, বিদেশিদের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিতে কিছু বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। ভিসার আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিককে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চীনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বাড়তি কড়াকড়ি
চীনে ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ওপর কিছু বিধিনিষেধ অবশ্য নতুন নয়। বিশেষ করে গোপনীয় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে—এমন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
এখন সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ওপর আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।
বিদেশি প্রভাব ঠেকাতে বেইজিং যে বৃহত্তর উদ্যোগ নিয়েছে, এসব পদক্ষেপ তারই অংশ বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশিদের চীন ছাড়ার অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা
নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তদন্তের কারণ দেখিয়ে তাদের কিছু নাগরিককে চীন ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেও বিভিন্ন বিদেশি সরকার জানিয়েছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত মিয়ানমার-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন নাগরিক মিন জিনকে চীনা কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। গত জুনে জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পরে তার আটকের ঘটনাকে অন্যায় হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগও ওঠে।
তাইওয়ানের নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ
নতুন বিধিমালা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে তাইওয়ানও। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং তাইওয়ানের বাসিন্দাদের চীনা নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে।
নতুন নিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে তাইওয়ান তাদের নাগরিকদের চীন সফরের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।