
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যে ডিজেলসংকট তৈরি হয়েছে, তা ২০২৭ সালেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, এর ফলে জ্বালানির চড়া দাম আরও দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে সরবরাহে বড় ধাক্কা
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না।
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজেলের মজুদও ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মজুদের ঘাটতির সম্মিলিত প্রভাবে জ্বালানিটির বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিজেলের দামে। সংকটের কারণে ডিজেলের মূল্য রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।
তবে এই সংকটের প্রভাব কেবল জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও ভারী পরিবহনসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাত ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব এসব খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রথমবার ৬ ডলার ছাড়াল
যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলসংকটের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। চলতি মাসে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষক ও ট্রাকচালকদের ব্যয়ও বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিজেলের উচ্চমূল্যকে কেন্দ্র করে মার্কিন অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্যও রাজনৈতিকভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ডিজেলসংকট দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই—জ্বালানি সংরক্ষণ বা স্টোরেজ বাজারের পরিস্থিতিতেও এর একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
স্টোরেজ ব্রোকার প্রতিষ্ঠান দ্য ট্যাংক টাইগারের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শোধনাগার ও জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ডিজেল রাখার জন্য নেওয়া গুদাম ও অন্যান্য স্টোরেজের লিজ নবায়ন করছেন না।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত ডিজেলই পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্থাৎ বাজারে সরবরাহের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে জ্বালানি মজুদ করার বদলে বিদ্যমান সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় নিজেদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছে।
২০২৭ সালেও সরবরাহে স্বস্তি না ফেরার আশঙ্কা
বাজারে মজুদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০২৭ সালেও ডিজেল সরবরাহে বড় ধরনের স্বস্তি নাও ফিরতে পারে।
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বিভিন্ন ধরনের বিঘ্নের কারণে বিশ্ববাজারে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ডিজেলের উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে কৃষি, পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে যেতে পারে।
ডিজেলনির্ভর এসব খাতে ব্যয় বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
এ কারণে দীর্ঘস্থায়ী ডিজেলসংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের চাপের কারণ হয়ে থাকতে পারে।