
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি শিক্ষক।
রোববার (৪ অক্টোবর) ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের শিক্ষকরা শিক্ষার অধিকার টিকিয়ে রাখতে ‘বেঁচে থাকার এক বাস্তব লড়াইয়ের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই তারা নিয়মিতভাবে হামলা ও নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন।
ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের কারণে গাজা ও পশ্চিম তীরের শিক্ষা অবকাঠামো ব্যাপক ধ্বংসের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি এখনো ১৭০-এর বেশি শিক্ষক ইসরাইলি হেফাজতে রয়েছেন। আটক এসব শিক্ষক ‘কঠিন পরিস্থিতির’ মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
শিক্ষকদের দুর্ভোগ শুধু হামলা ও আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং শত শত চেকপোস্টে হয়রানির কারণেও তাদের স্বাভাবিক জীবন ও কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে হেবরনের দক্ষিণের মাসাফের ইয়াত্তা, পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলের আল-মুগাইয়ির গ্রাম, জর্ডান উপত্যকা এবং ‘এরিয়া সি’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে শিক্ষকরা বেশি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
১৯৯৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করা হয়। ‘এরিয়া এ’ ফিলিস্তিনি বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ‘এরিয়া বি’-তে বেসামরিক প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের হাতে থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের। আর পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশজুড়ে থাকা ‘এরিয়া সি’ পুরোপুরি ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন।
নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটও ফিলিস্তিনি শিক্ষকদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফিলিস্তিনের করের অর্থ আটকে রাখার কারণে শিক্ষকদের আর্থিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
‘ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ’ নামে পরিচিত এসব অর্থ মূলত আমদানি করা পণ্যের ওপর ইসরাইল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হয়ে যে কর সংগ্রহ করে, সেখান থেকে আসে। ১৯৯৪ সালের প্যারিস প্রটোকল অনুযায়ী এই অর্থ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা।
তবে ২০১৯ সাল থেকে ইসরাইল এসব রাজস্বের একটি অংশ কেটে রাখা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অর্থ স্থানান্তরও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং সরকারি কর্মীদের নিয়মিত ও পূর্ণ বেতন দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে।
ফিলিস্তিনের মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৫৬ শতাংশই ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ থেকে আসে। ফলে এই অর্থ আটকে যাওয়ায় সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধের পাশাপাশি সরকারি সেবা পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং শিক্ষা ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
একই সঙ্গে ইসরাইলি হেফাজতে থাকা শিক্ষকদের মুক্তি এবং আটকে থাকা ফিলিস্তিনি রাজস্বের অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোকে কার্যকর চাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু