
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইহুদি ভোটারদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়ায় তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বিরোধীরা। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে আরব নিউজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের পূর্বাভাসে বলা হয়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোট পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেতে পারে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো পেতে পারে রেকর্ড ১৯টি আসন। তবে ভোট গণনা শেষ না হওয়ায় ফল পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধী পক্ষ—কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তবে ইসরায়েলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা এসব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের বিরোধিতা করেন।
নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী বছর আবার নির্বাচন হলে তত দিনও তিনি এ দায়িত্বে থাকতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি বলেন, আইনগতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা নিয়মিত সরকারের সমান। তবে এ ধরনের সরকারের ওপর সংযম প্রদর্শনের দায়িত্ব থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার রাতে নিজের লিকুদ পার্টির সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের মিত্র উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করার ক্ষেত্রে দুই দেশের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। এর আগে ট্রাম্পও ইসরায়েলি ভোটারদের নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর ট্রাম্প দাবি করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁর সমর্থন ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা আইজেনকট নেতানিয়াহুর অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক করেছেন। নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর হাতে নতুন সরকারের ম্যান্ডেট নেই এবং জনগণের আস্থাও নেই। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে দেশটির আর্থিক বাজারেও। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইসরায়েলের মুদ্রা শেকেলের দর প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে এক ডলারে ৩ দশমিক ১০ শেকেলে নেমেছে। তেল আবিবের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলোও ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলার পর এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সেখানে ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ক্রমেই সমালোচনার মুখে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলছে। এসব অভিযোগকে তিনি প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যেও ভোটদানের হার ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই নেতানিয়াহু সরকারের আরববিরোধী অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন।
আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের কার্যালয়ে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। জোটটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, তাঁরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসরায়েলেই থাকবেন।
আগের এক নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটকে একটি ছোট আরব দলের সমর্থন নিতে হয়েছিল। এবার আইজেনকটের জোট প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পাওয়ায় আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া তাদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: আরব নিউজ, রয়টার্স