
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে দুর্নীতির কাঠামো তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, একই সঙ্গে এই খাতে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে। “অন্তর্বর্তী সরকার ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি স্বচ্ছ ও টেকসই রোডম্যাপ রেখে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, “প্রথমেই দুর্নীতির যে আর্কিটেকচারটি ছিল, সেটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালের দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত ১৬–১৭ মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি।”
তিনি জানান, দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি জাতীয় পর্যায়ের কমিটি পদ্ধতিগত দুর্নীতির চিত্র চিহ্নিত করেছে। অন্যটি বিচারপতি ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটি, যা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। “এই তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য রাখা হবে,” বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বন্ধ করা হয়েছে। আগে একই মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অধীনস্থ কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন, যা বাতিল করা হয়েছে। এখন কোনো সচিবই তার অধীন বিভাগের কোম্পানির চেয়ারম্যান নয়।
উপদেষ্টা বলেন, খাতভিত্তিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ এবং মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি-২০২৫। পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে বিদ্যমান অস্থিরতা নিরসনে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে একটি নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বর্তমানে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বিদ্যুৎ ট্যারিফ নিয়ে অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য বুয়েটের নেতৃত্বে একটি কমিটি প্রকল্পভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছে। কোথায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতের প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “বিপুল পরিমাণ বিদেশি বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে তেল ও এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম কমানো সম্ভব হয়েছে। বিপিসির তেল আমদানিতে রিফাইনারি মালিকানার শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং প্রিমিয়াম প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। ছয় মাসে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৫৭ বছরের পুরোনো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে ৩১,০৫৭ কোটি টাকায় আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রিফাইনারি ইউরো-৫/৬ মানের হবে, যা পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক।
গ্যাস অনুসন্ধান প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান সময়সাপেক্ষ। অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে সংশোধিত চুক্তি প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে নতুন সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কয়লা উত্তোলন প্রকল্পে না যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন হয়েছে। সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে নতুন করে কয়লা প্রকল্পে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ফিজিবিলিটি স্টাডি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, “এ বছরের মার্চে ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যাওয়ার আশা। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়বে। আদানি চুক্তি আন্তর্জাতিক আইনি পর্যালোচনায় রয়েছে। বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখতে ব্যয় কমানো ও সীমিত ভর্তুকি বজায় রাখা হবে।”
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগে, তবে আশা করছি নির্বাচিত সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে।”