
দীর্ঘ পাঁচ দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে একাধিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি দল অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত ৯টি দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে চারটি ইসলামি দল মিলিয়ে মোট ৭২টি আসন অর্জন করেছে, যা ১৯৭৩ সালের পর প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন তারেক রহমান সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। একই সঙ্গে হেভিওয়েট দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও আরও তিনটি ছোট ইসলামি দল সংসদে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি জয় পেয়েছে ২০৯টিতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসন অর্জন করেছে জামায়াতে ইসলামী। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও ইসলামী ধারার আরও তিনটি দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ‘রিকশা’ প্রতীকে দুটি আসনে জয়ী হয়েছে। একই জোটের শরিক খেলাফত মজলিস ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে একটি আসন পেয়েছে। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ‘হাতপাখা’ প্রতীকে একটি আসনে জয় লাভ করেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস উভয়ই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে জামায়াত ছাড়া অন্য কোনো ইসলামি দল সংসদে আসন পায়নি। অতীতে ২০০১ সালে জামায়াত ১৮টি এবং ২০০৮ সালে ২টি আসনে জয়ী হয়েছিল, যা মূলত বিএনপির সঙ্গে জোটের ফল ছিল। বিপরীতে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও ইসলামী ঐক্যজোটের মতো দলগুলো গত পাঁচ দশকের বেশি সময়েও কোনো আসন পায়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ময়মনসিংহ ২ এবং মাদারীপুর ১ আসনে জয়লাভ করেছে। মাদারীপুর ১ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বড় ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন।
ময়মনসিংহ ২ আসনে মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার পান ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৮ ভোট।
অন্যদিকে সিলেট ৫ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন।
দেশব্যাপী প্রায় সব আসনে প্রার্থী দিলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মাত্র একটি আসনে জয় পায়। বরগুনা ১ আসনে দলের প্রার্থী মো. অলি উল্লাহ ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা পান ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৫ ভোট। একই আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে পান ৬ হাজার ২৩২ ভোট।
তবে বেশ কয়েকটি আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। পটুয়াখালী ১ আসনে বিএনপির আলতাফ হোসেন চৌধুরী ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন, সেখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী পান ৫৮ হাজার ১৬১ ভোট।
পটুয়াখালী ৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের আবু বক্কর ছিদ্দিকী পান ৩৮ হাজার ১৮৮ ভোট। এই আসনে ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর জয়ী হন।
পটুয়াখালী ৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মোস্তাফিজুর রহমান ৭০ হাজার ১২৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। বিএনপির এবিএম মোশাররফ হোসেন সেখানে ১ লাখ ২৪ হাজার ১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
বরিশাল ৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মুফতী সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকেন। বিএনপির মজিবর রহমান সরওয়ার ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
ভোলা ১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের ওবায়দুর রহমান ২৫ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বিজেপির আন্দালিভ রহমান ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ৫১টি দলের মোট ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৪৭৮ জন সারা দেশে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।