
দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছে তাদের একমাত্র সন্তান মাহির সারোয়ার মেঘ। তবে পরিবারের এই উদ্বেগ ও হতাশার বিষয়টি তদন্ত সংস্থার কাছে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি ও পরিস্থিতি জানতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাগর-রুনির পরিবারের সদস্যরা।
সাক্ষাৎ শেষে রুনির ভাই নওশের রোমান সাংবাদিকদের বলেন, "আমাদের মেঘ খুবই হতাশাগ্রস্ত। এতগুলো বছর কেটে গেলেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আগে যেখানে প্রতি মাসে আদালতের মাধ্যমে মামলার আপডেট জানা যেত, এখন ছয় মাস পর পর সময় নেওয়া হচ্ছে। তদন্ত আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাই দেওয়া হচ্ছে না।"
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, "১৪ বছরেও কোনো অগ্রগতি থাকবে না—এর কি কোনো জবাবদিহি নেই? আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি যে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ব্যর্থ।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই মামলাটি এখন আর শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়, এর সাথে দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ ও জানার আগ্রহ জড়িত।
সাগর-রুনির সন্তান মেঘ নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে বলে, "অনেকেই আমার কাছে এই মামলার অগ্রগতি জানতে চান। কিন্তু আমি কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। কারণ আমরা নিজেরালেই কিছু জানি না। আমরা অন্ধকারে আছি।"
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন থাকলেও সংস্থাটি বেশ কিছু বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "১৫ বছর আগের একটি ঘটনার তদন্ত করতে গেলে প্রয়োজনীয় নথি, আলামত ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমনকি ঘটনার পরপর যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, তাদের অনেককে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।"
তদন্ত কর্মকর্তারা নতুন করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, "পরিবারের এই আকুতি ও হতাশার বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরব। রাষ্ট্রের কল্যাণে যেকোনো অপরাধের বিচার হওয়া উচিত এবং আমি এই পরিবারের প্রতি সম্পূর্ণ সমব্যথী।" তবে মামলার ভবিষ্যৎ বা তদন্ত সফল হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই শীর্ষ আইন কর্মকর্তা।
মামলাটির আইনি দিক বিশ্লেষণ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির জানান, আলোচিত এই মামলাটি বর্তমানে একটি "আলো-আঁধারের" মাঝে অবস্থান করছে।
তিনি বলেন, "অতীতের তদন্তগুলোতে কিছু জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আমি দুটি ডিএনএ প্রতিবেদনও দেখেছি, যার একটি আমেরিকার ল্যাব থেকে করা। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনটি ক্রসচেক করার জন্য সেখানে পাঠিয়েছিল। সেই ডিএনএ প্রতিবেদনগুলো মামলার নথিতে রয়েছে। এই আলামতগুলোর ওপর ভিত্তি করে এখনো একটি আশার আলো দেখা যেতে পারে।"
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এরপর থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মামলার তদন্ত চললেও এখন পর্যন্ত কোনো কূলকিনারা হয়নি।