
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ‘প্রবাসী কার্ড’ এবং তাদের আবাসন নিশ্চিতে ‘প্রবাসী সিটি’ গড়ে তোলার মেগা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের আনা এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
সংসদ অধিবেশনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও প্রত্যাশিত সেবা সবসময় পান না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ব্যাংকিং ও আবাসন সুবিধায় নতুন দিগন্ত
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার একটি বিশেষায়িত ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর কাজ করছে, যা সরাসরি ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে যুক্ত থাকবে। এর ফলে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা খুব সহজেই দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত তাদের স্বজনরাও সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।
এর পাশাপাশি প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী সিটি’ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার পূর্বাচলে এই আবাসন প্রকল্প শুরু হবে এবং পরবর্তীতে তা জেলা পর্যায়েও সম্প্রসারিত করা হবে। এছাড়া রাজধানীর গুলশানে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব জায়গায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিগত এক বছরে প্রবাসী কর্মীদের ৫ হাজার ২২৫ জন মেধাবী সন্তানকে শিক্ষা ভাতা বাবদ ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রবাসী পরিবারের প্রতিবন্ধী সন্তানদের ভাতা, বীমা দাবি, বিদেশফেরত কর্মীদের ক্ষতিপূরণ এবং মৃত কর্মীদের লাশ পরিবহন ও দাফন খরচসহ বিভিন্ন খাতে শত শত কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পাশাপাশি, বিদেশ থেকে ফিরে আসা প্রায় আড়াই লাখ কর্মীকে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই দক্ষ জনবলকে আবারও বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারেও কাজ করছে প্রশাসন।
হয়রানি বন্ধ ও সেবার মানোন্নয়ন
বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের দীর্ঘদিনের হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী জানান, সেখানে প্রবাসীদের উন্নত সেবা ও ভালো ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কল্যাণ কেন্দ্র’গুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরেও এই সেবার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কর্মীরা নির্যাতন বা অন্যায্যভাবে চাকরি হারালে তাদের আইনি সুরক্ষা দিতে ১০টি দেশের ল’ ফার্মের সাথে চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়া ওমানের মাস্কাট এবং সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দায় নির্যাতিত নারী কর্মীদের জন্য ৩টি ‘সেফ হোম’ পরিচালনা করছে সরকার। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রবাসীরা দেশ থেকে টোল-ফ্রি ১৬১৩৫ নম্বরে এবং বিদেশ থেকে +৮৮০৯৬১০১০২০৩০ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারবেন।
নতুন শ্রমবাজার ও রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহিতা
ঐতিহ্যবাহী মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের বাইরে গিয়ে সরকার এখন নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের বাজার ধরতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ ‘জাপান সেল’ গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরোপ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশে থাকা মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট সৃষ্টি না হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত থাকে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর চূড়ান্ত নির্বাচন মালয়েশিয়া সরকারই করে থাকে।"
অন্যদিকে, দেশের ভেতরের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনতে কঠোর যাচাই-বাছাই ও গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ হাজার এজেন্সির লাইসেন্স থাকলেও কড়া মূল্যায়নের মুখোমুখি হলে ৪০০ থেকে ৫০০টির বেশি এজেন্সি টিকতে পারবে না।
অভিবাসন খাতে সব ধরনের প্রতারণা রুখে দিয়ে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সাথে সমন্বয় রেখে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।