
সাংবাদিকতার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও দীর্ঘস্থায়ী আটকাদেশ মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য এক বড় হুঁশিয়ারি—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করে কারাবন্দি চার সাংবাদিকের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে বিশ্বমঞ্চের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনালসহ ৫ আন্তর্জাতিক সংস্থা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধের জোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বুধবার এই দাবি উত্থাপন করে।
কভারেজের দায়ে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত: আইনগত ত্রুটির অভিযোগ
যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের নিরাপত্তা অভিযান সংক্রান্ত সংবাদ প্রচারকে কেন্দ্র করে রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত চালানো হচ্ছে। প্রসিকিউশনের দাবি, এই দুই সাংবাদিক নিহতের সংখ্যা নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ছড়িয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই মামলায় গত ১৪ মে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগপত্র বা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সামনে আনা হয়নি।
এই তদন্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংস্থাগুলো জানায়, কোনো রাজনৈতিক বা বিতর্কিত ঘটনার সংবাদ প্রচার কিংবা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় বিচার করা সম্পূর্ণ আইনি পরিপন্থী। এটি সরাসরি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের শামিল এবং পেশাদার সাংবাদিকদের মনে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করবে। সংস্থাগুলোর মতে, রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটিতে নেওয়া এই পদক্ষেপ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৫ এবং ১৯ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের পরিপন্থী।
দীর্ঘস্থায়ী আটকাদেশ ও জামিন স্থগিতে উদ্বেগ
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় নিহতের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিক ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু, শাকিল আহমেদ ও শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর থেকে বিচারপূর্ব আটকাবস্থায় (প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন) রাখা হয়েছে। অথচ এসব মামলার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা যায়নি। সংবাদ প্রচারের ভূমিকাকে কীভাবে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাও মেলেনি।
যদিও এ বছরের ১১ মে হাইকোর্ট রূপা ও শাকিল আহমেদকে অধিকাংশ মামলায় জামিন দিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা স্থগিত করে দেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিমত, ওই হত্যা মামলাগুলোর জামিনের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, ট্রাইব্যুনালের এই নতুন মামলাটি সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় কারাবন্দি রাখার একটি অতিরিক্ত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির স্মরণ
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, কেবল সাংবাদিকতা পেশার কারণে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে যেন কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিটে আসামি করা না হয়। সেই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইসিটিতে করা মামলাগুলো খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিযোগ প্রত্যাহার ও তাদের মুক্তিসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গণ-মামলা বা এফআইআর দায়ের বন্ধের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে যে, সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধের এই উদ্যোগগুলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তাই এই বিতর্কিত মামলাগুলো তুলে নেওয়ার মাধ্যমেই সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে এই পাঁচ বিশ্বসংস্থা।