
দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মো. মোজাফফর হোসেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তাঁর এই চাঞ্চল্যকর গ্রেফতারের পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (বীরউত্তম) হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী সেনা বিদ্রোহের নানা অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে নতুন করে দেশজুড়ে জোর গুঞ্জন ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী সেনা বিদ্রোহ, মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরের রহস্যজনক মৃত্যু এবং তৎকালীন রাজনৈতিক-সামরিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধোঁয়াশা ও বিতর্ক রয়ে গেছে। সেই সময়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করায় ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কুশীলবদের চেহারা এবং সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
জিয়া হত্যার একমাত্র জীবিত সূত্র: নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়?
নথি ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. মোজাফফর হোসেনই বর্তমানে একমাত্র জীবিত প্রতিনিধি। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আত্মগোপনে থাকায় এই ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আনুষ্ঠানিকভাবে জানার কোনো সুযোগ রাষ্ট্র বা ইতিহাসবিদদের ছিল না। তাঁর এই সাম্প্রতিক গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু স্পর্শকাতর ও অমীমাংসিত অধ্যায় উন্মোচনের পাশাপাশি জাতির সামনে সত্য উপস্থাপনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে প্রাপ্ত নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণের সাথে মিলিয়ে তাঁর দেওয়া তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেজর মোজাফফরের অতীত ঘেঁটে জানা গেছে, তিনি মূলত জাতীয় রক্ষী বাহিনীতে (জিআরবি) প্রথম কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন। ১৯৮১ সালে যখন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তখন তিনি চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দেশটির একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছত্রছায়ায় আত্মগোপনে থাকেন। সে সময় আইন ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি ছদ্মনাম হিসেবে ‘বিপ্লব সরকার’ এবং ‘জয় ব্যানার্জি’ নাম দুটি ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে এসে ভিন্ন পরিচয়ে বসবাস শুরু করেন।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব
১৯৮১ সালের সেই ভয়াল সেনা বিদ্রোহ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্তরালে থাকা মূল সত্য ও ষড়যন্ত্র উদঘাটনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ কমিটিতে সেনাবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই, এনএসআই, বাংলাদেশ পুলিশ এবং প্রয়োজনে অন্যান্য গোয়েন্দা ও আইনি সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়াও, তদন্ত কার্যক্রম যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়া ফলপ্রসূভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সেজন্য মেজর মোজাফফর হোসেনকে ডিজিএফআই-এর ‘জয়েন্ট ইন্টাররোগেশন সেন্টার’ (জেআইসি) অথবা সেনাবাহিনীর ‘আর্মি ইন্টাররোগেশন সেল’ (এআইসি)-এ রেখে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য বের করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো যেকোনো ঐতিহাসিক সত্যের উন্মোচনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো। ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নয়; বরং সমাজে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নির্ভুল ও বিকৃতিহীন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হওয়া উচিত। এই তদন্তের মাধ্যমে উঠে আসা সত্য যাই হোক না কেন, তা যেন কোনো জাতীয় বিভাজন তৈরি না করে; বরং ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও জাতীয় ঐক্যের মজবুত ভিত্তি হিসেবেই পরিগণিত হয়।