
সারা দেশে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা শুরু হয়েছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় বর্ণিল রথ শোভাযাত্রা বের করা হয়। শুধু শোভাযাত্রাই নয়, রথযাত্রাকে ঘিরে দেশজুড়ে মেলা, ভক্তিমূলক গান, ধর্মীয় আলোচনা, সমবেত প্রার্থনা, পদাবলি কীর্তন, ভাগবতকথা, ধর্মীয় নাটক, বৈদিক নাচ, শিশু-কিশোরদের নানাবিধ প্রতিযোগিতা এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের মতো নানান উৎসবমুখর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
সনাতন পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতি বছর চন্দ্র আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই পুণ্যময় রথযাত্রা শুরু হয়ে থাকে। এর ঠিক নয় দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত হয় উল্টো রথযাত্রা। সেই নিয়ম মেনে আগামী ২৪ জুলাই এবারের উল্টো রথযাত্রা উদযাপিত হবে।
ইসকনের নয় দিনব্যাপী বর্ণিল মহোৎসব ও বিশেষ যজ্ঞ
জগন্নাথ দেবের এই পুণ্যতিথি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশে নয় দিনব্যাপী এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য মহোৎসবের ডাক দিয়েছে, যা গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ ইসকন আশ্রম মন্দির প্রাঙ্গণে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবজাতির কল্যাণ এবং দেশের চলমান বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের দ্রুত মুক্তি কামনায় বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বিশেষ ১০৮টি অগ্নিহোত্র যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুরে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই আনন্দ শোভাযাত্রার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইসকন বাংলাদেশের সভাপতি সত্যরঞ্জন বাড়ৈর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ভক্তিময় নিতাই স্বামী।
ঢাকার রাজপথে ভক্তদের ঢল ও ঢাকেশ্বরীতে রথ পৌঁছানো
বিকেলের দিকে স্বামীবাগ ইসকন মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে তিনটি সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন আধুনিক ফোল্ডিং রথে জগন্নাথ দেব, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীর শ্রীবিগ্রহ স্থাপন করে রাজপথে বের করা হয় মূল শোভাযাত্রা। হরিনাম সংকীর্তনের সুরে নেচে-গেয়ে এই শোভাযাত্রায় শামিল হন হাজার হাজার ভক্ত ও পুণ্যার্থী। যাত্রাপথে রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্ত চিনি ও কলা ছিটিয়ে পরম ভক্তিতে রথকে স্বাগত জানান। এরপর বর্ণিল এই শোভাযাত্রাটি রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে সমাপ্ত হয়।
ইসকনের চলমান এই উৎসবের প্রতিদিনের কর্মসূচিতে রয়েছে জগন্নাথ লীলামৃত পাঠ, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত পাঠ, রথযাত্রার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা, সন্ধ্যা আরতি, ভজন ও পদাবলি কীর্তন, শিশু-কিশোরদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বৈদিক নাটক এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ। এর পাশাপাশি স্বামীবাগ মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে বসেছে ঐতিহ্যবাহী রথের মেলা।
আগামী ২৪ জুলাই ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে এই মহোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। ওইদিন বিকেল ৩টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে ফিরতি শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে পুনরায় স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে এসে পৌঁছাবে।
ইসকনের এই প্রধান উৎসব ছাড়াও পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দির, জয়কালী রোডের রামসীতা মন্দির এবং শাঁখারীবাজার একনাম কমিটিসহ রাজধানীর বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মন্দির এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পুণ্যার্থীরা অত্যন্ত ভক্তিভরে রথটান উৎসবে মেতে ওঠেন।