
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে টেকসই ও ঝঁকিমুক্তভাবে বেরিয়ে আসা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বৃদ্ধির সুপারিশ চেয়েছে বাংলাদেশ। এই বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বিশেষ কৌশলগত রূপরেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আজ ও আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইকোসকের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের এই আবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বৈঠক থেকে সময়সীমা কত বছর বাড়ানো যায়, সে সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক সুপারিশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে আগামী সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায় বাংলাদেশ সরকার। এর পরপরই গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বিশেষ চিঠির মাধ্যমে জাতিসংঘ মহাসচিবের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের সময় বৃদ্ধির আবেদনকে নীতিগত সমর্থন জানালেও নির্দিষ্ট কত বছর সময় বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ করেনি।
এই পরিস্থিতিতে ইকোসকের বৈঠককে সামনে রেখে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে ঢাকা। গত শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইকোসকের সভাপতি লোক বাহাদুর থাপা (নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি) ও ইকোসকের সহসভাপতি (আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি) এর সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সেখানে ইআরডি প্রণীত কৌশলগত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর স্থায়ী প্রতিনিধিদের সাথে সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল মতবিনিময় করেছে। এর আগে গত ২ জুলাই ঢাকায় দায়িত্বরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সাথে এবং ৯ জুলাই কাঠমান্ডুতে ইকোসক সভাপতির সাথে সরকারের পক্ষ থেকে একই বিষয়ে আলোচনা সম্পন্ন হয়।
কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সরকার ব্যাখ্যা করেছে যে বিশ্বব্যাপী নানামুখী আর্থিক ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বিগত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের মূল নীতিই হলো—এলডিসি উত্তরণের ফলে যেন কোনো দেশের অর্জিত উন্নয়ন থমকে না যায়। কিন্তু বিগত চার বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের অবনতি দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রাকে বিঘ্নিত করেছে।
নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সরকার বলছে—জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি খাত ও রাজস্ব আদায়ে সৃষ্ট ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। ফলে সময় বৃদ্ধির আবেদন উন্নয়ন থেকে পিছু হটা নয়; বরং একটি পরিকল্পিত, টেকসই ও সুদৃঢ় উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্যই নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে জানান, সিডিপির সুপারিশের পাশাপাশি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মতামত ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করবে ইকোসক। তাই আগামী সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পর্যন্ত বাংলাদেশকে এই কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি সরকারের ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ দ্রুত বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম বেগবান করার ওপর তাগিদ দেন।
অপরদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, ইকোসক ঠিক কত বছরের সময় বাড়ানোর সুপারিশ করে, তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তীতে সরকারের কাজ ও প্রস্তুতির নতুন রূপরেখা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এলডিসি পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জাতীয় কাস্টমস ব্যবস্থাকে আধুনিক ও গতিশীল করার বিকল্প নেই, যাতে আমদানি-রপ্তানির সমস্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মাত্র এক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।