
নিজেকে কখনো ছোট না ভেবে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আজকের কিশোর-কিশোরীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাই নিজেদের দক্ষ, সৎ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৫-২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তোমরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারো, তাহলেই আমরা ভবিষ্যতে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—গ্যালারিতে যে হাজার হাজার ছোট বন্ধুরা তোমরা বসে আছ, তোমাদের মধ্য থেকেই এই দেশের ভালো ডাক্তার, ভালো স্থপতি, ভালো প্রকৌশলী, ভালো ক্রিকেটার, ভালো সাঁতারু ও ভালো টেনিস খেলোয়াড় তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্ম থেকেই দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেরা খেলোয়াড় ও গুণী ব্যক্তিত্ব উঠে আসবে। “আজ তোমরা সেটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছ। তোমাদের মধ্য থেকেই এমন ভালো মানুষ তৈরি হবে, যারা এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কাজেই নিজেকে কখনো ছোট ভাববে না, নিজেকে বড় করে গড়ে তুলতে হবে। তুমি যত শক্তভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে, তোমার বাংলাদেশকেও তত সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবে।”
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মিডিয়ার ভাই যারা এখানে উপস্থিত আছেন—সেটি ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়া যাই হোক—আপনাদের এবং আপনাদের সম্পাদকদের কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। আমরা সব সময় দেখি, পত্রিকায় বা খবরে বিভিন্ন বিষয়কে হাইলাইট বা ‘লিড নিউজ’ করা হয়। তবে আজ আপনারা যে ইভেন্টটি দেখে গেলেন, সেটিই মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।”
তিনি আরও বলেন, “যারা প্যান্ডেলের নিচে বসে আছে, যারা গ্যালারিতে বসে আছে তারা হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, যত খবরই থাক না কেন, আগামীকাল আপনাদের পত্রিকা ও সম্প্রচারমাধ্যমে এই শিশুদের খেলার সংবাদটি যেন ‘লিড নিউজ’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। আশা করি, আজকের রাতের সংবাদে ও আগামীকালের পত্রিকায় আমাদের এই ভবিষ্যৎদের সুন্দরভাবে তুলে ধরবেন।”
দেশের শিক্ষা ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার সেগুলো দূর করার চেষ্টা করছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষের মৌলিক সুবিধাও অপর্যাপ্ত। এসব সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধানে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার এই কাজ তখনই সার্থক হবে, যখন গ্যালারি ও সামনের সারিতে বসে থাকা তোমরা নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারবে। আজকের এই নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ইভেন্ট থেকে আমি তোমাদের কাছে একটি অঙ্গীকার নিতে চাই—তোমরা যদি নিজেদের গড়ে তোলো, তবেই আমরা একযোগে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।”
এরপর অনুষ্ঠানে উপস্থিত কিশোর-কিশোরীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, “বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে কে কে কাজ করবে?” তিনি সবাইকে হাত তুলতে বললে গ্যালারিতে থাকা হাজারো শিক্ষার্থী একযোগে হাত তুলে সম্মতি জানায়। এ সময় তিনি তাদের ধন্যবাদ জানান।
পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পড়ার সময়ে মন দিয়ে পড়তে হবে, আর খেলার সময় একইভাবে মনোযোগ দিয়ে খেলতে হবে।”
পরিবেশ সংরক্ষণেও শিশু-কিশোরদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশটা আমাদের সবার। এই দেশের আলো, বাতাস ও পরিবেশ যদি আমরা সবাই মিলে ঠিক রাখি, তবেই আমরা একটি সুন্দর পরিবেশে বাঁচতে ও পড়াশোনা করতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, “তোমাদের কাছে আমার একটি বিশেষ অনুরোধ—রাস্তায় বা বাসার আশপাশে, এমনকি পুকুর-নদীনালায় কাউকে প্লাস্টিকের বোতল বা ময়লা ফেলতে দেখলে তোমরা তাকে বারণ করবে। প্রয়োজন হলে সেই ময়লাটি তোমরা নিজেরা তুলে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে ফেলবে।”
নদী-খাল ও জলাশয় পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোরও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “কেউ জলাশয়ে ময়লা ফেললে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করবে, যাতে নদী ও পুকুরের পানি পরিচ্ছন্ন থাকে এবং মানুষ তার পাড়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারে। এছাড়া আমার আরেকটি চাওয়া হলো—তোমরা প্রতিবছর বাড়ি বা স্কুলের আশপাশে অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে। আমরা যদি গাছ লাগাতে পারি, তবে আমাদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন হবে এবং আমরা সবাই বুক ভরে বিশুদ্ধ শ্বাস নিতে পারব।”
শিশুদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা তোমাদের পাশে আছি। তোমরা যারা পড়াশোনা করতে চাও, সরকার থেকে আমরা সেই ব্যবস্থা করব যাতে সবাই ভালোভাবে পড়ালেখা করতে পারো। এছাড়া যারা গান গাইতে, ছবি আঁকতে কিংবা খেলাধুলা করতে চাও—সরকারের পক্ষ থেকে তোমাদের সব ধরনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে তোমাদের সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তোমরা যদি নিজেদের যোগ্য করে তোলো, তবেই আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। এই গড়ার কাজ হয়তো আমরা শুরু করেছি, কিন্তু একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্ব তোমাদেরই।”
অনুষ্ঠানে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সব প্রতিযোগী ও বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সন্তানদের এ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে অবদান রাখা অভিভাবক, শিক্ষক ও কোচদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতায় এই পর্যন্ত আসার ক্ষেত্রে সন্তানদের পেছনে যাদের অবদান রয়েছে—সেই বাবা-মা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সহায়তাকারী কোচদের আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
অনুষ্ঠানে ফুটবলের বালক বিভাগে সিলেট অঞ্চল এবং বালিকা বিভাগে রংপুর অঞ্চল চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্রেস্ট, মেডেল ও চেক বিতরণ করেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলম। উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ, মীর হেলাল, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
উল্লেখ্য, গত ২ মে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ক্ষুদে ক্রীড়াবিদ আটটি ডিসিপ্লিনে অংশ নেওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা রাজধানীর বিভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়।