
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের পদে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারি নিয়োগে আবারও লবিং, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে বিএনপি সরকার।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি চাকরির পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা তুলে ধরেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
‘শুধু রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো’
পোস্টের শুরুতেই ‘শুধু রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো’ লিখে হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারি কর্মচারী নিয়োগে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘চরম আত্মঘাতী’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি লেখেন, সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গ্রেড ১১-২০ এর ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে বিএনপি সরকার সরকারি চাকরির নিয়োগে আবারও লবিং, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে যেখানে লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়ানো এবং ভাইভার প্রভাব কমানোর দাবি ছিল, সেখানে সরকার সেই দাবির বিপরীত পথে যাচ্ছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, যে জায়গায় দীর্ঘদিনের দাবি ছিল লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়িয়ে ভাইভার প্রভাব কমানো, সেখানে তারা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছে। এর ফলে মেধাবী প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুরো নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
লিখিত পরীক্ষার ফল কি ভাইভায় বদলে যাবে?
ভাইভার মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা একজন প্রার্থীকে পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নও তুলেছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি লেখেন, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী ভালো করেও যদি ভাইভায় লবিং, মামা-খালু বা টাকার জোরে পিছিয়ে যায়, তাহলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের আর অর্থ কী?
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ কোনো রাজনৈতিক দলের লোক বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বদলে যদি পুরোনো সেই পথ আবার খুলে দেওয়া হয়, তাহলে এর চেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আর কী হতে পারে!
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার হিসাব তুলে ধরে হাসনাত জানান, গ্রেড ১১–১২-তে লিখিত পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের বিপরীতে ভাইভায় রাখা হয়েছে ৫০ নম্বর। গ্রেড ১৩-১৬-তে ভাইভার নম্বর ৪০ এবং গ্রেড ১৭০-২০-এ ২৫ নম্বর।
তাঁর মতে, এর ফলে লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী যে মেধাক্রম অর্জন করেছেন, ইন্টারভিউ বোর্ডের (interview board) সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট (subjective assessment) দিয়ে সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁর আপত্তির জায়গা মূলত এখানেই।
হাসনাত আবদুল্লাহর মতে, লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে অবজেক্টিভ (objective)। কারণ প্রত্যেক প্রার্থী একই প্রশ্নে এবং একই সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি সাবজেক্টিভ (subjective) হওয়ায় সেখানে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ থাকে।
তিনি লেখেন, কুমিল্লা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য লেখেন, লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে অবজেক্টিভ (objective)। সবাই একই প্রশ্নে, একই সময়ে পরীক্ষা দেন। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি সাবজেক্টিভ (subjective)। ফলে ভাইভার নম্বর যত বাড়বে, ইন্টারভিউ বোর্ডের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা (discretionary power) তত বাড়বে।
আর এই স্বেচ্ছাচারে (discretion) জায়গায় স্বচ্ছতা (transparency) ও দায়বদ্ধতা (accountability) দুর্বল হলে পক্ষপাত, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
‘১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরাই জনগণের সরাসরি সেবাদাতা’
১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকার বিষয়টিও নিজের পোস্টে তুলে ধরেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তাঁর মতে, এই শ্রেণির কর্মচারীরা মূলত তৃণমূল পর্যায়ের আমলা বা স্ট্রিট-লেভেল ব্যুরোক্র্যাট (street-level bureaucrat)। জনগণের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগের জায়গায় তাঁরাই মূল সেবাদাতা বা সার্ভিস প্রোভাইডার (service provider) হিসেবে কাজ করেন।
তিনি লেখেন, গ্রেড ১১-২০ এর কর্মচারীরা মূলত তৃণমূল পর্যায়ের আমলা (street-level bureaucrat)-সরাসরি জনগণের সেবাদাতা (service provider)। সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা নিতে গেলে তাদের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সেবা নিতে হয়।
তাই এই পর্যায়ের নিয়োগে পক্ষপাতমূলক বিবেচনা (partisan consideration) প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়াকে কোনোভাবেই ছোট বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাসনাতের ভাষ্য, এই পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা যদি দলীয় বিবেচনায় কাজ করেন, তাহলে শুধু জনগণ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না, একই সঙ্গে ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরির আশঙ্কাও থাকবে।
তিনি আরও লেখেন, তৃণমূল পর্যায়ের আমলারা (street level bureaucrat) যদি ন্যাংসঙ্গত (fair) এবং জনগণের সেবক না হন, তাহলে সরকার যে সেবাই চালু করুক, হোক তা ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড, তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের লোকজনের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
সরকারি চাকরির নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, সরকারি চাকরি কোনো দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়। একজন মানুষকে রাষ্ট্রের হয়ে জনগণকে সেবা করার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগের সময় যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত পরিচয় বা পক্ষপাতের প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সেই কর্মকর্তা ভবিষ্যতে কতটা নিরপেক্ষভাবে জনগণকে সেবা দেবেন-সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অর্থাৎ, নিয়োগের সময় যে ধরনের বিবেচনা প্রভাব ফেলবে, পরবর্তী সময়ে ওই কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন এই সংসদ সদস্য।
ভাইভা বাতিল নয়, চান কাঠামোবদ্ধ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা
হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, তিনি মৌখিক পরীক্ষা পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন না। বরং তাঁর দাবি, ভাইভা এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে মূল্যায়ন হয় নির্দিষ্ট কাঠামো, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে।
তিনি লেখেন, আমরা ভাইভা বাতিলের কথা বলছি না। বরং ভাইভাকে আরও গঠনমূলক (structured), স্বচ্ছ (transparent) এবং দায়বদ্ধ (accountable) করতে হবে। কিন্তু, লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে বড় ধরনের সাবজেক্টিভ (subjective) নম্বর দিয়ে উল্টে দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ভাইভা থাকলেও সেটির জন্য নির্দিষ্ট বিধি বা রুব্রিকস (Rubrics) থাকা দরকার। একইভাবে সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট (Subjective assessment) থাকতে পারে, তবে তা নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া (criteria)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
হাসনাতের ভাষায়, আমাদের অবস্থান পরিষ্কার-ভাইভা থাকুক্ কিন্তু নির্দিষ্ট বিধি (Rubrics) মেনে। সাবজেক্টিভ অ্যাসেসমেন্ট (Subjective assessment) থাকুক, কিন্তু নির্দিষ্ট মানদণ্ডের (criteria) মধ্যে। ইন্টারভিউ বোর্ড (Interview board) থাকুক, কিন্তু unchecked discretion নয়। আর সরকারি নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধা ও যোগ্যতাই হোক একমাত্র ভিত্তি।
‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি’
সরকার যদি সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ এবং জনগণবান্ধব প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের বা বোর্ডের discretionary power বাড়ানোর বদলে transparency, accountability এবং merit-based recruitment আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি লেখেন, সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন চায়, তাহলে নিয়োগে discretionary power বাড়ানোর পরিবর্তে transparency, accountability এবং merit-based recruitment শক্তিশালী করা উচিত।
নিজের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ভাইভা রাখার বিষয়ে তাঁর আপত্তি নেই; আপত্তি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে মৌখিক পরীক্ষার subjective নম্বর ব্যবহার করে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত objective merit-কে পরাজিত করার সুযোগ থাকবে।
হাসনাত লেখেন, আমাদের আপত্তি ভাইভায় নয়; আপত্তি এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে ভাইভার subjective নম্বর দিয়ে অবজেক্টিভ মেধাকে (objective merit) পরাজিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
পোস্টের শেষ দিকে সরকারি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন কুমিল্লা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য।
তিনি লেখেন, আমরা দিনশেষে সেই বাংলাদেশে ফিরতে চাই না যেখানে সরকারদলীয় নেতা ঘোষণা করার ক্ষমতা পায় যে, ‘তোরা রিটেনটা পাশ কর, ভাইভা আমরা দেখবো।’