
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব সীমান্তে পড়ায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মানবিক কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের অফিসকক্ষে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমারের (আইআইএমএম) প্রধান নিকোলাস কৌমুজিয়ানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে মিয়ানমারে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বৈশ্বিক সহায়তা দিন দিন কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের জন্য আগের মতো উচ্চমাত্রায় আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এই সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি, যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়।
বৈঠকে আইআইএমএম প্রধান নিকোলাস কৌমুজিয়ান বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আইআইএমএমের একটি দল কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে প্রায় দুই শতাধিক ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
সংগৃহীত তথ্য ও প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নিকোলাস কৌমুজিয়ান আরও জানান, আইআইএমএমের তদন্ত শুধু ২০১৭ সালের ঘটনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষের কারণে বেসামরিক মানুষের ওপর সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
বৈঠকে সীমান্তে মিয়ানমার অংশে পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন বিজিবি মহাপরিচালক। তিনি জানান, পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার কারণে এসব মাইন সীমান্তরেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে চলে আসছে। এতে সীমান্ত এলাকার সাধারণ কৃষক ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এ সময় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সীমান্ত পরিস্থিতির সার্বিক চিত্রও বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা ভুক্তভোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আইআইএমএমের প্রতিনিধিদল মাঠপর্যায়ের বিজিবি কমান্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সম্মতি জানানো হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আসন্ন রায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে ওই রায় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।