
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনের ঘটনা জানতে এক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে তাহসিফ ও তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, তাঁকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, তাহসিফের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনার অংশ—তা নিশ্চিত হতে তাঁর বক্তব্যসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ সম্প্রতি একটি নতুন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। এতে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ মোটরসাইকেলে পৌঁছান তাহসিফ ও ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। এ সময় হেলমেট পরা অবস্থায় দীপও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।
ভিডিওতে ওই তরুণীর পরনে গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস দেখা যায়। তাঁর হাতে ছিল একটি সাদা পলিথিনের ব্যাগ। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার দিকে চলে যান। ওই তরুণীও তাঁদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
তদন্তকারীদের ধারণা, তরুণীকে শনাক্ত করা গেলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
পুলিশের ধাওয়া নিয়ে দীপের বক্তব্যে সন্দেহ
দীপের রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাঁর ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, ঘটনার রাতে তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। আদালতে দেওয়া নথিতে পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, মাজার বস্তি এলাকায় ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ সদস্যকে দেখে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে দুই দিকে দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
তবে তদন্তকারীরা তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান। তাঁদের ধারণা, ওই এলাকায় মাদক সেবন কিংবা অন্য কোনো অপরাধের সন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ধাওয়া করে থাকতে পারেন। কিন্তু কথিত দুই পুলিশ সদস্যের পরিচয় কী, তাঁরা সত্যিই দায়িত্ব পালনরত পুলিশ ছিলেন কি না, ধাওয়ার কারণ কী ছিল এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়লেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
এ ছাড়া ঘটনাস্থলে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল পৌঁছানোর বিষয়টিও তদন্তকারীদের কাছে অস্পষ্ট। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
চার দিনের রিমান্ডে দীপ
নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনাপ্রবাহে দীপের উপস্থিতি ছিল। ফলে তাঁকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
তিনি বলেন, তাহসিফ পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে আগে থেকে পরিকল্পিত কোনো ঘটনা ছিল, তা গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সেটিও শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাঁর ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন দীপ
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই দীপকে হেফাজতে নেয়। পরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়। শুক্রবার রাতে তাঁকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ।
শুনানি শেষে আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর সূত্র খুঁজছেন তদন্তকারীরা।