দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার রেওয়াজ নিয়ে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ১৪ মে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র একদিনের ব্যবধানে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
শুক্রবার (১৫ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মিয়া গোলাম পরওয়ার এই কড়া সমালোচনা ও নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
উচ্চশিক্ষায় দলীয়করণ ও জেলা পরিষদের প্রসঙ্গ
বিবৃতিতে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল স্পষ্ট করে বলেন, সাধারণ মানুষ মনে করে এই পদায়নগুলোতে প্রার্থীর মেধা, নিরপেক্ষ অবস্থান ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা না করে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় সংশ্লিষ্টতাকেই অন্ধভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠগুলোতে এই ধরনের নগ্ন দলীয়করণের সংস্কৃতি চালু হওয়া পুরো জাতির ভবিষ্যৎ প্রগতির জন্য চরম আশঙ্কাজনক। এর আগে গত ১৫ মার্চ দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে অনির্বাচিত দলীয় প্রশাসক বসানোর ঘটনাতেও জামায়াতের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।
তিনি সেই ঘটনার যোগসূত্র টেনে আরও বলেন, তখন জামায়াতের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে, সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রশাসক বসানো সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী এবং এটি স্থানীয় সরকার কাঠামোকে দলীয় খপ্পরে নেওয়ার একটি অপচেষ্টা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সরকার সেই অগণতান্ত্রিক পথ থেকে সরে তো আসেইনি; উল্টো এখন সেই একই অপরাজনীতি দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে দিচ্ছে।
শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের আশঙ্কা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। সেখানে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক অ্যাকাডেমিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়। অতীতে দলীয়করণের কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা, সেশনজট ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছিল, জনগণ আবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।"
তিনি আরও যোগ করেন, ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পর এ দেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল যে, বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের একের পর এক কর্মকাণ্ডে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, তারা রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে নিজেদের কুক্ষিগত ও দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পুরনো পথেই হাঁটছে। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা অঙ্গন পর্যন্ত সর্বত্র দলীয় আধিপত্য বিস্তারের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শিক্ষা ও গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের এক অশনিসংকেত।
উপাচার্য পদের মতো সংবেদনশীল জায়গায় নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল মন্তব্য করে জামায়াত নেতা বলেন, সরকার তা না করে একটি অগণতান্ত্রিক ও পক্ষপাতমূলক পথ বেছে নিয়েছে, যা প্রকারান্তরে দেশের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।
নিয়োগ বাতিলের দাবি
বিবৃতির শেষ অংশে বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমরা এই দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা অবিলম্বে এসব নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে সত্য, ন্যায় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করুন।"