
ঢাকার সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়ন সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, ঋণনির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক নানা সূচক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান কাঠামোয় বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
আলোচনার শুরুতে অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এরপর বাজেটের বাস্তবতা বোঝাতে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। সংসদে তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য, ওনার নাম ধরে নিলাম মফিজ। সেই সদস্যেরর মাসে বেতন যদি ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা হয়। এর বাইরে তাঁর কোনো গার্মেন্ট ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো ইয়াবা ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো অস্ত্রের ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো অবৈধ ব্যবসা নাই। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন হলো ঢাকা শহরে তিন একর জায়গার ওপরে প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করে সামনে একখানা সুইমিংপুল থাকবে; হরিণ, ম্যাকাও পাখি পুষবেন। কিন্তু তাঁর এই ১ লাখ ৭৬ হাজার সৎ টাকায় কি ঢাকায় তিন একর জায়গায় প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করা সম্ভব? সম্ভব নয়।’
এই উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পর তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ—৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আদায় করতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংস্থাটি ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি আদায় করতে পেরেছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান ১০ মাসে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলতে পারেনি, তাকে এক বছরে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত?’ তাঁর মতে, লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হবে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে। তিনি বলেন, সরকার বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির কথা বললেও বাস্তব পরিবেশ এখনো অনুকূল নয়, বরং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ সুদের হার বড় প্রতিবন্ধকতা।
বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম হওয়াকেও তিনি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এমন অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেকারত্ব নিয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী তা সোয়া এক কোটির বেশি। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না বলে মন্তব্য করেন তিনি, এবং এই অবস্থাকে অনেক সময় ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, আর বিভিন্ন হিসাব যোগ করলে তা প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত সরকারের অতিরিক্ত ঋণের চাপ নিতে পারবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বৈদেশিক ঋণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। ঋণের সুদ পরিশোধেই বাজেটের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যয় হবে, অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্য খাতে সম্মিলিত বরাদ্দ ৩০ শতাংশেরও কম।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। তবে কিছু ইতিবাচক দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিতে পারে।
কর কাঠামোর সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত হলেও মাসে প্রায় ৩২ হাজার টাকা আয়কারী ব্যক্তিও এখন করের আওতায় পড়ছেন, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় চাপ সৃষ্টি করছে।
আয়বৈষম্য নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন, দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে এবং ১ শতাংশ ধনী নিয়ন্ত্রণ করে এক-চতুর্থাংশ সম্পদ। তাঁর অভিযোগ, করের চাপ মূলত বেতনভোগী ও দৃশ্যমান আয়ের মানুষের ওপরই বেশি পড়ে, অথচ অনেক বড় সম্পদের মালিক করের বাইরে থাকেন।
শেষে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১.৮ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে আরও কম। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এই খাতে আরও বেশি ব্যয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় কম থাকায় মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যার ফলে প্রতিবছর অনেক পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে।
শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার আগে শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজিতে মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘ম্যান্ডারিন বা জার্মান শেখানোর আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে একজন শিক্ষার্থী যেন শুদ্ধভাবে বাংলা, ইংরেজিতে লিখতে ও বলতে পারে।’