
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুই নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন দলটির এক পদপ্রত্যাশী নারী কর্মী। অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে এনসিপি।
শুক্রবার (১৯ জুন) চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ির একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগগুলো তুলে ধরেন ওই নারী কর্মী। তিনি নিজেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, এনসিপির একজন কর্মী এবং চট্টগ্রাম মহানগর নারীশক্তির একটি পদের প্রত্যাশী হিসেবে পরিচয় দেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, সাংগঠনিক পদ দেওয়ার আশ্বাসে তাকে চট্টগ্রামের একটি অভিজাত হোটেলের বারে ডাকা হয়েছিল। সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং অস্বস্তিকর প্রস্তাব দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাংগঠনিক বৈঠকের কথা বলে গত ১৪ জুন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে নগরের পেনিনসুলা হোটেলে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, হোটেলের ছাদসংলগ্ন বারে সুজা উদ্দিন কয়েকজনের সঙ্গে অবস্থান করছেন। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব এবং জাতীয় নারীশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া আফরিন।
অভিযোগকারী বলেন, সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর তাকে ধূমপান ও মদ্যপানে উৎসাহিত করা হয় এবং বিভিন্ন পানীয় গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি অস্বস্তি প্রকাশ করলে সাদিয়া আফরিন তাকে সুজা উদ্দিনের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেন বলেও অভিযোগ করেন।
তার দাবি, কিছুক্ষণ পর সাদিয়া আফরিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে স্থান ত্যাগ করেন। এরপর সুজা উদ্দিন বারবার তাকে নিজের পাশে বসতে বলেন। অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, তার আচরণ, অঙ্গভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অশালীন এবং যৌন হয়রানিমূলক।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় সুজা উদ্দিন তাকে ‘ডিল অর ডেথ’ বলে হুমকিসূচক মন্তব্য করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবি এবং আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, হোটেল থেকে বেরিয়ে তিনি সাদিয়া আফরিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তখন সাদিয়া তাকে বলেন, ‘রাজনীতি করতে হলে বড় পদ-পদবিধারীদের ব্যক্তিগত সময় দিতে হয়। এটাই রাজনৈতিক কালচার।’
তিনি জানান, এ ঘটনায় আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন ও সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে গত ১৭ জুন চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে, মহানগর শাখার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় বলেন, দলের দুই নেতার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক ও মানহানিকর।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব সাদিয়া আফরিন এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
এদিকে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দলটির দাবি, কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে অনুমাননির্ভর, বিভ্রান্তিকর কিংবা মনগড়া মন্তব্য থেকে বিরত থাকার জন্য দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি।