
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বরিশাল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তার বাবা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতও ছিলেন মন্ত্রী। বড় ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তবে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে বরিশালের ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার ছেলে প্রকাশ্যে আসেননি। তাদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে জয়ী হন। তবে অসহযোগ আন্দোলনের পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করলে তার সংসদ সদস্যপদও বাতিল হয়ে যায়।
বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক এই সংসদ সদস্য ছোট ছেলে সেরনিয়াবাত আশিক আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে ভারত চলে গেছেন। বর্তমানে তিনি সেখানে তার মেয়ে আঞ্জুমানারা কান্তা আব্দুল্লাহর বাসায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। কান্তা একজন ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তার স্বামী দিল্লিতে অবস্থিত হজরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর দরগাহ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেও জানা যায়।
একাধিক সূত্র জানায়, আঞ্জুমানারা কান্তা দীর্ঘদিন বাবার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন পরিচালনার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশের কাজেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।
আরও জানা গেছে, যেকোনো রাজনৈতিক সংকটের সময় বিকল্প আশ্রয় হিসেবে ভারতকে আগেই বেছে রেখেছিলেন হাসানাত আব্দুল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভারতে অর্থ পাচার করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদও গড়ে তুলেছিলেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার আগেই তিনি দেশ ছাড়েন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
হাসানাত আব্দুল্লাহর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে এক দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা খায়রুল বাশার গত ২ আগস্ট ফেসবুকে একটি ছবি প্রকাশ করে লেখেন, ‘শর্ট নোটিশে মুম্বাই যাচ্ছি।’ বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য, ওই দিনই হাসানাত আব্দুল্লাহ ভারত যান।
অন্যদিকে, হাসানাতের ছেলে ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার ছোট ভাই, সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। সাদিক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তিনি মানুষের কাছে আতঙ্কের প্রতীক ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত ও মাদকাসক্ত সাদিক আব্দুল্লাহ টর্চার চেম্বারও তৈরি করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখা হাসানাত আব্দুল্লাহ গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের ধরন অনুযায়ী তিনি ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমিশন নিতেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। গৌরনদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র মো. হারিছুর রহমান হারিছ এসব কার্যক্রম তদারকি করতেন। ২০১৪ সালের পর থেকে এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয় বলে জানা যায়। আগৈলঝাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ লিটন সেরনিয়াবাত ওই উপজেলার দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই দুই নেতার মাধ্যমেই পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো। একইভাবে জেলা পরিষদের টেন্ডার ও বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে ছিলেন হাসানাতের ছোট ছেলে আশিক আব্দুল্লাহ।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির (৪০ দিনের প্রকল্প) শ্রমিক সরবরাহ নিয়েও হারিছ ও লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আগৈলঝাড়ায় প্রতিদিন ২০০ শ্রমিকের হিসাবে ৪০ দিনের জন্য ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং গৌরনদীতে প্রতিদিন ৩০০ শ্রমিকের হিসাবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায় করা হতো। এসব অর্থ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর কাছে পৌঁছাত এবং তিনি তা নেতাকর্মীদের মধ্যে বণ্টন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাও সহযোগিতা করতেন বলে জানা গেছে। এর বিনিময়ে প্রতিবার তারাই দলীয় মনোনয়ন পেতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জেলা পরিষদের টেন্ডার ও বিভিন্ন কাজের বিপরীতে আশিক আব্দুল্লাহ মোটা অঙ্কের অর্থ নিতেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নগরীর কালীবাড়ি সড়কে অবস্থিত হাসানাত আব্দুল্লাহর বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে তিনতলা ভবনটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পরে ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর গাজী নাঈমুল ইসলাম লিটুসহ তিনজনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ঘটনার কয়েক মিনিট আগে সাদিক আব্দুল্লাহকে ভবনের ছাদে দেখা গিয়েছিল। সে সময় বাড়িতে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী অবস্থান করছিলেন। এর আগে দুপুরে তাদের নিয়ে সদর রোড এলাকায় মহড়াও দেন সাদিক।
জানা গেছে, বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়িতে প্রবেশ করার পর সাদিক আব্দুল্লাহ বাড়ির পেছনের একটি গেট দিয়ে বেরিয়ে যান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও সাত বছরের সন্তান। প্রথমে তারা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে সন্ধ্যার পর হাসপাতাল রোডে গিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে সোনালী সিনেমা হলের দিকে চলে যান।
প্রবল গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাত্র সাত দিন পর, ১৩ আগস্ট বরিশালে যান সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর মেজ ছেলে মঈন আব্দুল্লাহ। তিনি আগুনে পুড়ে যাওয়া পারিবারিক বাড়ি পরিদর্শন করেন এবং মায়ের কবর জিয়ারত শেষে ফিরে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের ছেলে মুয়াজ আরিফ। এই সফর বরিশালে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মঈন আব্দুল্লাহ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, কালীবাড়ি রোড থেকে মঈন আব্দুল্লাহ নগরীর মুসলিম গোরস্থানে গিয়ে তার মা বেগম সাহানারা আব্দুল্লাহ এবং কাউন্সিলর গাজী নাঈমুল হোসেন লিটুর কবর জিয়ারত করেন। এরপর তিনি বরিশাল ত্যাগ করেন।
হঠাৎ এই সফর নিয়ে জানতে চাইলে মঈন আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমার জন্মস্থান বরিশালে আমি যাব, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি রাজনীতি করি না। আমি একজন ব্যবসায়ী, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক এবং সিআইপি।’
উপদেষ্টার ছেলের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সে তো আমার ছোটবেলার বন্ধু। সেই শিশুকাল থেকে আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। বন্ধুত্ব আর রাজনীতি মিলিয়ে ফেলবেন না।’