
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশপাশেই তাঁর জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে—এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকারের ভেতরের কারও যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও তরুণদের কর্মসংস্থান’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় যুবশক্তি আয়োজিত জাতীয় যুব সম্মেলনে বক্তব্য দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সেখানে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি গোখরা সাপ। আপনি এদের থেকে সতর্ক থাকুন। আপনার মন্ত্রণালয়ে অনেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। তাদের বিষয়ে সতর্ক হোন। আপনার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও আরেকবার যাচাই করুন। কারণ, আপনি বাতির নিচের অন্ধকার দেখতে পান না। যারা আপনার সমস্যা তৈরি করবে, তারা আপনার আশপাশেই রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কথা উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসেবে আপনাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু পারিবারিক ব্যবসা যদি ভাবেন, বাবা চালিয়েছেন, মা চালিয়েছেন, এখন আমি চালাব, তাহলে সেখানে আমরা প্রশ্ন তুলব। সেটির নাম জবাবদিহি।’
সরকারের কাছে নিরাপত্তা, তরুণদের কর্মসংস্থান, চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংকট নিরসনের অগ্রগতি জানতে চান তিনি। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দিতে হবে উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে হলে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তা না হলে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে এবং এনসিপি প্রস্তুত থাকবে। প্রয়োজনে রাজপথে লড়াই হবে।
১১ দলীয় জোটের ঐক্য নিয়ে ছড়ানো গুঞ্জনও নাকচ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর দাবি, সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের প্রশ্নে জোটের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নে একটি সম্প্রসারিত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই কমিটি মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে।
জোটের শীর্ষ নেতারা সাম্প্রতিক একটি লংমার্চে অংশ না নেওয়ায় দূরত্বের আলোচনা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে জোটের নেতারা অংশ নিতে পারেননি। অসুস্থতা বা অন্য ব্যস্ততার কারণে কারও অনুপস্থিতি হতে পারে। প্রতিটি কর্মসূচিতে সবার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়।
জোটে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার কথাও জানান তিনি। নাসীরুদ্দীন বলেন, জোটে গিয়ে শুধু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়াই তাঁদের রাজনীতি নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জোটের অন্য নেতাকে ‘জি হুজুর’ বলার যে প্রবণতা রয়েছে, তা তাঁরা অনুসরণ করবেন না।
তিনি আরও বলেন, জোটে থেকেও সরকার ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি চাইবে এনসিপি। দলটি কোনো জোট বা বিরোধী দলের রাজনীতি করে না, বরং গণমানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। মানুষের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাবই তাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতার অভিযোগ তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দুই দলের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট। বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য আওয়ামী লীগ থেকে টাকা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মামলা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক উপদেষ্টার বক্তব্যেও এ ধরনের ইঙ্গিত এসেছে বলে উল্লেখ করেন এনসিপির এই নেতা।
তাঁর অভিযোগ, সরকার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে চলছে। যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে শেখ হাসিনার জায়গায় তারেক রহমান এলে দুই নেতার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন বলেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে দুটি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল—একটি লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির, যেখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন; অন্যটি রিফর্ম অ্যাসেম্বলির। ২০২৯ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নেই—এমন বক্তব্যের কারণে বর্তমান সরকারের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির এক নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, জুলাই আন্দোলনকারীদের নিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক আলোচনায় গালাগালির সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাসীরুদ্দীন। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এতে তরুণ ও নাগরিক সমাজের অনেকে হতাশ হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে ঘেরাও কর্মসূচি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ছাত্রদল-যুবদলের কোটায় নিয়োগের অভিযোগও তোলেন তিনি।
সরকারের চালু করা কার্ড কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা দলীয় লোকজনের ভাগ্য পরিবর্তনে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন গার্মেন্টসসহ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং বিদেশ থেকে কর্মী আনতে হচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের যথেষ্ট নজর নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ এবং সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) দলীয়করণের শিকার হয়েছে বলেও দাবি করেন এনসিপি নেতা।
তাঁর মতে, এমন কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই একজন শিক্ষার্থী চাকরি পান। শিক্ষার্থীদের চাকরি খুঁজতে হবে না, বরং চাকরিই তাঁদের খুঁজে নেবে—এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। সরকার তা করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এনসিপি ক্ষমতায় গেলে কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
প্রবাসীদের অধিকার নিয়েও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বিদেশে বাংলাদেশিরা আক্রান্ত হলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং আকামার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, পাঁচ লাখ টাকার আকামার জন্য ২০ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে যেতে গিয়েও তরুণদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশিরা নানা সমস্যায় রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এনসিপি ক্ষমতায় গেলে তরুণদের অংশগ্রহণে তারুণ্যনির্ভর সরকার গঠন করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদেও তরুণদের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ সোহেল।