
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারার পর ট্রফির বদলে রানার্সআপ পদক গলায় ঝুলেছে লিওনেল মেসির। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের অশ্রুসিক্ত মুহূর্ত ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। তবে এই হারেও ফুটবল কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, থিয়েরি অঁরি, ক্যাসপার স্মাইকেল, অ্যালেক্সি লালাস ও পিটার ক্রাউচ একবাক্যে বলেছেন, মেসির মহত্ত্বকে কোনোভাবেই ম্লান করতে পারে না এই পরাজয়।
রোববার (১৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে স্পেন। ম্যাচ শেষে রানার্সআপ পদক গ্রহণের সময় মেসির চোখে জল ধরা পড়ে টেলিভিশন ক্যামেরায়।
ফক্স স্পোর্টসের আলোচনায় জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলেন, ‘এই বিশ্বকাপে আমরা মেসিকে মন ভরে উপভোগ করেছি। বিশ্বকাপ জিততে না পারায় সে অবশ্যই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে সে ছিল অবিশ্বাস্য। প্রায় একাই দলকে ফাইনালে নিয়ে গেছে। সে যা করেছে, সেটা জাদুর মতো।’
এবার ছিল মেসির ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সেও টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ৮টি গোলের পাশাপাশি করেন ৪টি অ্যাসিস্ট। প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে গোল না পেলেও তিনটি গোল তৈরিতে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ে তার দুটি অ্যাসিস্ট ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে ইব্রাহিমোভিচ আরও বলেন, ‘কখনো মনে হয়েছে সে এই গ্রহের মানুষ নয়, আবার কখনো একেবারে সাধারণ মানুষের মতো লড়াই করেছে।’
এই ৮ গোলের সুবাদে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। গ্রুপ পর্ব শেষে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে সেই রেকর্ড নিজের করে নেন।
ফাইনালে অবশ্য আক্রমণে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে দলটি মাত্র দুটি শট নিতে সক্ষম হয়, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। মেসিও একটি শট নিলেও গোলের দেখা পাননি। তার পাঁচটি ক্রসের মধ্যে মাত্র একটি সতীর্থের কাছে পৌঁছায়। স্পেনের কৌশলী রক্ষণে পুরো ম্যাচজুড়েই অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিলেন তিনি।
তবে থিয়েরি অঁরি মনে করেন, এটি মেসির ব্যর্থতা নয়, বরং স্পেনের সফল পরিকল্পনার ফল। তিনি বলেন, ‘মেসির বিপক্ষে কখনোই বাজি ধরা যায় না। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো দলই প্রয়োজন ছিল।’
ডেনমার্কের সাবেক গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেলও মেসির পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে মেসির মতো ফুটবলারকে বিচার করা বোকামি। সে ফাইনাল বেশি হারলেও আমার কাছে সে-ই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল শুধু জেতার নাম নয়, খেলাটিকে কী দিয়ে গেলেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আর মেসির অবদান তুলনাহীন।’
একই মত প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফুটবলার অ্যালেক্সি লালাস। তার ভাষায়, ‘সে একজন চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়নরা সব সময় জিততে চায়। তাই এই হার তাকে কষ্ট দেবে। কিন্তু একটি ম্যাচের ফল ভুলে এখন আমাদের তার অসাধারণ ক্যারিয়ার নিয়েই কথা বলা উচিত।’
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচ বলেন, ‘আজকের স্পেন দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছে। তারা তার খেলায় অনুপ্রাণিত। যদি এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ হয়, তাহলে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে বিদায় জানাচ্ছি।’
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মেসির কান্নার দৃশ্য নিয়েও আবেগ প্রকাশ করেন থিয়েরি অঁরি। তিনি বলেন, ‘এই কান্নাই প্রমাণ করে, এত কিছু জয়ের পরও দেশের জন্য তার জেতার ক্ষুধা একটুও কমেনি। দেশের প্রতি ভালোবাসা আর নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।’
মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ইব্রাহিমোভিচ আশা ছাড়ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, সে যত দিন সম্ভব খেলুক। সে পরের বিশ্বকাপে থাকবে কি না জানি না। তবে যত দিন খেলবে, আমরা উপভোগ করব। যেদিন সে বিদায় নেবে, সেদিন ফুটবল বিশ্বের সবার মন খারাপ হবে।’