
সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা অর্পণের সুযোগ রেখে একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখা তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত সম্মতি ও চূড়ান্ত স্বাক্ষর না মেলায় গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তিটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলে রয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসেই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় প্রাসঙ্গিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন করে তৈরি হওয়া সামরিক সংঘাত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির দরুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নথিতে সই করতে বিলম্ব করছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি, মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে চরম বিরোধিতা ও বাধার আশঙ্কাকেও এই বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমার মূল উপাদান তৈরিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই সিভিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিজেরা সমৃদ্ধকরণ না করে বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত ইউরেনিয়াম ক্রয় করে থাকে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পর্যাপ্ত ও কঠোর নজরদারি না থাকলে এই চুক্তির সুযোগ নিয়ে রিয়াদ অদূর ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।
বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে কারণ এর আগে এক সাক্ষাৎকারে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন,
ইরান যদি পারমাণবিক বোমা বানায় তাহলে সৌদি আরবও বানাবে।
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই খসড়া চুক্তিতে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর ও স্বাধীন নজরদারির সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়নি। ফলে সংস্থাটি চাইলেও সৌদির যেকোনো সন্দেহজনক বা গোপন পরমাণু কেন্দ্রে প্রবেশ কিংবা পরিদর্শন পরিচালনা করতে পারবে না; সম্পূর্ণ তদারকির বিষয়টি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্লেষকেরা ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে হওয়া চুক্তির উদাহরণ টেনে আনছেন। আমিরাত সে সময় পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠিন শর্তাবলী ও স্বচ্ছতা সানন্দে মেনে নিয়েছিল, যা পারমাণবিক অখণ্ডতার ইতিহাসে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণমান হিসেবে সমাদৃত।
প্রতিরক্ষা ও পরমাণু বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী ভূরাজনৈতিক দেশের হাতে এই ধরণের স্পর্শকাতর প্রযুক্তি হস্তান্তর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যেকোনো জাতীয় সংকটে রিয়াদ একতরফাভাবে এই কেন্দ্রগুলোর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারে। অবশ্য চুক্তির সমর্থকদের দাবি, এই সমঝোতা রূপায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পারমাণবিক শিল্পের জন্য হাজার কোটি ডলারের বড় ধরণের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চুক্তিটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে আরও বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটন যদি রিয়াদকে এই সুযোগ না দেয়, তবে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে আরও শিথিল শর্তে এই প্রযুক্তি কিনে নিতে পারে। বিপরীতে বিরোধীরা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য এভাবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তার নিয়ম শিথিল করা হলে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।