
অনলাইনে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ রাখতে নিজেদের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে এরই মধ্যে শিশু অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র আপত্তি দেখা দিয়েছে।
ইইউর ২৭ সদস্যদেশ কীভাবে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনতে চায়, আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বহুল প্রত্যাশিত এক ভাষণে সেই পরিকল্পনা তুলে ধরবেন ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ডন ডার লেয়েন।
১৩ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছেন ভন ডার লেয়েন। একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এই বয়সসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। তবে ফ্রান্স আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চায়।
অস্ট্রেলিয়ার পর জোরালো হয়েছে উদ্যোগ
ডেনমার্ক ও গ্রিসসহ ইইউর কয়েকটি দেশ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার বিষয়ে চাপ দিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পর ইইউর উদ্যোগ আরও জোরালো হয়।
ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি দেশও অস্ট্রেলিয়ার নেওয়া পথ অনুসরণ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচকদের বক্তব্য, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর এসব প্ল্যাটফর্মের নেতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ দিন দিন বাড়ছে। ইইউ শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, সেটি কার্যকর করার জন্য চলতি বছরের শেষ দিকে বয়স যাচাইয়ের একটি ব্যবস্থা চালু করা হবে।
শিশুদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
তবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা নিয়ে ব্রাসেলসকে বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হতে পারে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড টেকনোলজি (সিডিটি) ইউরোপের কর্মকর্তা ক্রিশ্চিয়ান সিরহিগিরি বলেন, ‘শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো, শিশুদের অনলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ নয়।’
‘প্ল্যাটফর্মগুলোর পরিবর্তন হওয়া উচিত’
শিশু অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের যুক্তি, এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হলে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে তাদের বিকাশে সহায়ক বিভিন্ন তথ্য ও সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারে।
সিরহিগিরি এএফপিকে বলেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ শিশুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘন করবে। তাঁর ভাষ্য, জাতিসংঘের সনদেও এসব অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
শিশু অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রায় ১৩২টি সংগঠন ও বিশেষজ্ঞও সবার জন্য একক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন।
এএফপির হাতে আসা উরসুলা ডন ডার লেয়েনকে দেওয়া এক চিঠিতে তারা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্ম আরও নিরাপদ করতে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইইউর ২৭ সদস্যদেশের মধ্যে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সব দেশ একমত নয়।
এস্তোনিয়ার ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী লিসা-লি পাকোস্তা এএফপিকে বলেন, ‘তথ্য পাওয়ার অধিকার কেন নিষিদ্ধ করা হবে, তা নৈতিকভাবে বোঝা খুব কঠিন।’
তার মতে, ‘বরং প্ল্যাটফর্মগুলোর পরিবর্তন হওয়া উচিত।’
ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টে পদক্ষেপ
অনলাইনে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ইইউ ইতোমধ্যে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’ প্রয়োগ করেছে।
এই আইনের আওতায় চলতি বছর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটককে ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তুলতে পারে—এমন ডিজাইন বা ফিচার পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইডিআরআইয়ের কর্মকর্তা সিমিওন দে ব্রাওয়ার মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গাটি তরুণদের অনলাইনে থাকা নয়। বরং অনলাইন পরিবেশকে নিরাপদ করে তুলতে ব্যর্থতাই মূল সমস্যা।