
অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ড। রবার্ট হল ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং মাইকেল উডফোর্ড নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। পুরস্কার ঘোষণায় বলা হয়, তাঁদের উদ্ভাবিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই মডেলের ভিত্তিতে যথাসময়ে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পদক্ষেপ নেওয়া হলে অর্থনীতির উত্থান-পতন সামাল দেওয়া সহজ হয়।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন মডেলের গুরুত্ব
অর্থনীতি সাধারণত প্রবৃদ্ধি ও মন্দার বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এগোয়। এ ধরনের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীলতা নীতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে কেইনসীয় অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশের পর সরকারের ব্যয় ও অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
তবে ১৯৭০-এর দশকে তেল সংকটের সময় প্রচলিত কেইনসীয় মডেলগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ওই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই পরিস্থিতি পুরোনো অর্থনৈতিক ধারণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড তাঁদের গবেষণায় সামষ্টিক অর্থনীতির মডেল নতুনভাবে সাজানোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নীতিকে আরও কার্যকর করার পথ দেখিয়েছেন। অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদন, ভোগ ও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি তাঁরা পরিবার এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পৃথক সিদ্ধান্তের বিষয়টিও মডেলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
মানুষ ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় সঞ্চয় করে, আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রত্যাশা অনুযায়ী পণ্যের দাম নির্ধারণ করে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপথে কী প্রভাব ফেলে, তা তাঁদের গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির পরিবর্তনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ভোক্তাদের ব্যয় হঠাৎ কমে যাওয়ার মতো ধাক্কা মোকাবিলায় এ ধরনের মডেল কার্যকর হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব
পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার বলেন, বিজয়ীদের গবেষণা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতির জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার ইতিমধ্যে এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ধারণা ব্যবহার করছে।
হাসলার আরও বলেন, জ্বালানি সংকট কিংবা ভোগব্যয় কমে যাওয়ার মতো আকস্মিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন আগের তুলনায় ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিজয়ীদের কাজের মূল গুরুত্ব হলো, অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু বড় পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই হয় না; পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কীভাবে পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, সেটিও নীতিনির্ধারণে বিবেচনায় নিতে হয়।