
সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে রেকর্ড ১৯টি আসনে জয় পাওয়ার পর ইসরায়েলের আরব দলগুলো বিরোধী নেতা গাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের এই অবস্থানের ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবারও সরকারপ্রধান হওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য কোনো জোটের প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ও চরমপন্থী দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বে প্রধান চারটি দলের বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ৪৮। তবে ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি আরব দলের সমর্থন পেলে বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। এতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতিও এড়ানো সম্ভব।
বিরোধী দলগুলোর পরিবর্তনপন্থী জোট ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পেছনে ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে আরব দলগুলোর সমর্থন আদায় করা আইজেনকোটের জন্য সহজ হবে না। কারণ, নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ইহুদি ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রকাশ্যে আরববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরবদের আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ সময় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
নির্বাচনে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায়। এর ফলে মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রাম পার্টি আটটি এবং ইউসেফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন যৌথ তালিকা বা জয়েন্ট লিস্ট ১১টি আসন পেয়েছে। এর আগে আইজেনকোট ইহুদি ভোটারদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার কথা বলেছিলেন। তবে সরকার গঠনের হিসাব মেলাতে এখন দুই পক্ষকেই কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হতে পারে।
নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ নেতানিয়াহুর দলের
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ দাবি করেছে, বিদেশি সহায়তায় আরব দলগুলো ভোটে অনিয়ম করেছে। ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে তিন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও দলটি তাদের দাবির পক্ষে তুলে ধরেছে। তবে রোববার আদালত একজন সন্দেহভাজনকে মুক্তি দিয়েছেন এবং অপরজনকে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান নোয়াম সোহলবার্গ অ্যাটর্নি জেনারেল ও শিন বেটের প্রধানের সঙ্গে এক যৌথ ভিডিও বার্তায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও ফলাফলের বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো সন্দেহগুলো প্রমাণিত হলেও এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা বা সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফলকে ক্ষুন্ন করবে না।’
অন্যদিকে বিরোধী দল ও আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সমঝোতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বর্ণনা করেছে লিকুদ। দলটির সতর্কবার্তা, জায়নবাদী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর সহযোগিতা ‘ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক’। এদিকে সম্ভাব্য এই রাজনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করে রোববার রাতে আইজেনকোটের বাড়ির সামনে কয়েক ডজন মানুষ বিক্ষোভ করেন।
সরকারে না গিয়ে বাইরে থেকে সমর্থনের পরিকল্পনা
আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। সোমবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ইউসেফ জাবারিন বলেন, বেন-গভির ও স্মোটরিচের মতো চরমপন্থী নেতাদের ক্ষমতার বাইরে রাখতে তাঁরা পরিবর্তনপন্থী জোটকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
জাবারিন জানান, তাঁদের দল বিরোধী জোটে সরাসরি যুক্ত হবে না। বরং বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় ভোট দিয়ে আইজেনকোটকে একটি ‘সংখ্যালঘুর সরকার’ গঠনে সহায়তা করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘আইজেনকোট যেসব শর্তের কথা বলেছেন সেগুলো জোটে থাকা দলগুলোর জন্য প্রাসঙ্গিক। খুব স্পষ্ট কারণেই আমরা জোটে থাকার পরিকল্পনা করছি না... পশ্চিম তীরে আমাদের জনগণের ওপর দখলদারিত্ব চলা পর্যন্ত আমরা সরকারের অংশ হতে পারি না।’
সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন প্রার্থী
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নেসেটে নির্বাচিত ১১টি দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী পদে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য জোট গড়ার দায়িত্ব দেবেন তিনি।
আইজেনকোট কিংবা নেতানিয়াহু—যাঁকেই এই দায়িত্ব দেওয়া হোক, জোট গঠনের জন্য তিনি প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আইজেনকোট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যদিও সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। পাশাপাশি বিরোধী জোটের ভেতরে ভাঙন ধরিয়ে আটজন সদস্যকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর শিবির।
ইতিমধ্যে ইয়াশার পার্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, লিকুদ থেকে তাদের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে সরকার গঠনের আলোচনা যে পর্যায়েই থাকুক, নতুন জোট চূড়ান্ত না হলেও আগামী ১০ নভেম্বর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।