
ভারতের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের (এএমইউ) ১০৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন কোনো নারী। এই নজির গড়েছেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাশরা নাঈম। আট বছর বিরতির পর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ১৩টি পদের মধ্যে ছয়টিতে নারী প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া কার্যনির্বাহী কমিটির ১০টি সদস্য পদের পাঁচটিও গেছে তাঁদের দখলে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভোটের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। উত্তর প্রদেশের গোরখপুরের বাসিন্দা নাশরা পেয়েছেন ৭ হাজার ৯১টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ঝুলিতে পড়েছে ৫ হাজার ৮১৮ ভোট। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এলএলবি কোর্সে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন।
ছাত্র সংসদের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ নোমান আশরাফ। চার হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন তিনি। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন মোহাম্মদ হামদান।
নির্বাচনে প্রথমদিকে সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন নাশরা। তবে ক্যাম্পাসের তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে বাবা প্রথমে কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করলেও পরে পরিবারের সবাই তাঁর পাশে দাঁড়ান।
প্রচারণার সময় শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতবিনিময় এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আনেন নাশরা। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ কীভাবে তাঁদের জীবনে প্রভাব ফেলে, তা অনুধাবন করতে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ও নির্বাচনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও প্রত্যাশা নাশরার। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের অভাব দেখা যাচ্ছে। ছাত্র সংসদের কার্যক্রম আবার চালু হলে সেই ঘাটতি পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির যুক্তি দেখিয়ে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংসদ পুনরায় চালুর দাবিতে আন্দোলনে নামেন। টানা তিন বছর ধরে চলা সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯ দিনের কর্মসূচি পালন করা হয়। এক শিক্ষার্থীর অনশনও চলতে থাকে। এসব কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আয়োজনের পথ তৈরি হয়। গত ৫ নভেম্বর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
এএমইউ ছাত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক জাভেদ তালিব এবং উইমেনস কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক নাজিয়া হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সাম্প্রতিক ‘জেন-জি’ আন্দোলনের প্রভাব দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবার শিক্ষার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক দাবি-দাওয়ার মধ্যে আটকে থাকেনি। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ও শিক্ষার্থীদের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে শেষ হওয়ায় সন্তোষ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নাইমা খাতুন। তাঁর মতে, এই নির্বাচন প্রতিষ্ঠানের ‘উচ্চ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিজয়’। একই সঙ্গে নির্বাচনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্ব বাড়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। নারী ক্ষমতায়নের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের কোথাও কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।