
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের তুমুল আপত্তি ও সমালোচনার ঝড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটল মেটা। ইনস্টাগ্রামে সদ্য যুক্ত হওয়া এআই-ভিত্তিক ছবি তৈরির ফিচার ‘মিউজ ইমেজ’ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবের হাত ধরে তৈরি প্রথম ছবি নির্মাণের এই এআই টুলটি চলতি সপ্তাহেই ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
বিতর্কের নেপথ্যে কী ছিল?
‘মিউজ ইমেজ’ টুলের প্রধান আকর্ষণ ছিল—যেকোনো পাবলিক ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলকে ‘মেনশন’ করে, সেই অ্যাকাউন্টের ছবিকে রেফারেন্স বা উৎস হিসেবে ব্যবহার করে নতুন এআই ছবি তৈরি করা যেত। মেটার পরিকল্পনা ছিল পর্যায়ক্রমে সব ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার।
তবে মূল বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। কোনো ব্যবহারকারীর ছবি ব্যবহার করে এআই দিয়ে নতুন ছবি বানানো হলেও, সেই মূল অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে মেটার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নোটিফিকেশন বা বার্তা পাঠানো হতো না। অর্থাৎ, কার ছবি দিয়ে কী তৈরি হচ্ছে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।
তারকা ও একাধিক সংগঠনের ক্ষোভ
এই ফিচারের গোপনীয়তা ও সুরক্ষানীতি নিয়ে বিনোদন জগৎ ও বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অভিনেতা, চিত্রশিল্পী এবং মার্কিন অভিনোতা-শিল্পীদের ইউনিয়ন ‘স্যাগ-আফট্রা’ (SAG-AFTRA) মেটার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানায়। তাদের আশঙ্কা, মানুষের অনুমতি ছাড়া এভাবে ছবি ব্যবহারের সুযোগ থাকলে ছবি বিকৃতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এমি পুরস্কারজয়ী জনপ্রিয় অভিনেতা হ্যানা এইনবাইন্ডার তার ভক্তদের উদ্দেশে এই ফিচারটি বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি দেখতে পান, ব্যবহারকারীদের কোনো সম্মতি ছাড়াই ফিচারটি প্রোফাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করে রাখা হয়েছিল।
এই স্বয়ংক্রিয় সক্রিয়করণের কঠোর সমালোচনা করে অভিনেতাদের ইউনিয়ন স্যাগ-আফট্রা জানায়:
“একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
পাশাপাশি তারা আরও যোগ করে:
“জনমানুষের অনুভূতির কথা মাথায় না রেখে, বিপদ ও ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্যমান ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ফিচার চালুর ভুল উদ্যোগের” নিন্দা জানায় তারা।
মেটার এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে
চতুর্মুখী চাপের মুখে অবশেষে নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয় মেটা। শুক্রবার প্রকাশিত একটি অফিসিয়াল ব্লগ পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি জানায় যে, তারা এই ফিচারটি পুরোপুরি বাতিল করছে।
ব্লগ পোস্টে মেটা উল্লেখ করে:
“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সৃজনশীল টুল দেওয়া, যেখানে মানুষ তাদের পাবলিক কনটেন্ট এভাবে ব্যবহার করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন।”
ব্যবহারকারীদের আপত্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা আরও লেখে:
“তবে আমরা ব্যবহারকারীদের মতামত শুনেছি এবং বুঝেছি, এই ফিচারটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই এটি আর থাকছে না।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিশেষ করে নারী তারকাদের ডিপফেক বা আপত্তিকর ভুয়া ছবি তৈরিতে এআই-এর যথেচ্ছ ব্যবহার বারবার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যম সুরক্ষাকবচ তৈরির দাবি করলেও, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে—ইনস্টাগ্রামের এই ঘটনাটি যেন তারই নতুন এক উদাহরণ।