
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে চলমান অস্থিরতা পুরো ব্যাংকিং শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন। তাঁর মতে, দেশের বৃহত্তম এই ব্যাংকটির সংকট দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা জরুরি।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মাসরুর আরেফিন বলেন, “ইসলামী ব্যাংকে যা চলছে, তা পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলা শুরু করেছে। আমরা চাই দ্রুত দুই পক্ষ মিলে এর একটি সমঝোতা করুক।”
সভার শেষ অংশে ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গভর্নর ব্যাংকারদের কাছে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং দ্রুত সমাধানের উপায় খোঁজার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাসরুর আরেফিন বলেন, “গভর্নর আমাদের জানিয়েছেন—বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।” নিজে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে মাসরুর বলেন, “আমরা আশাবাদী যে একটা সমাধান হবে। গভর্নরকে আজকে যেরকম দৃঢ় দেখলাম, তাতে আমরা আশা করি দ্রুত একটা সমাধান পাওয়া যাবে।”
সভায় আলোচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রস্তাবিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি।
“বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি,” উল্লেখ করে মাসরুর আরেফিন বলেন, “ক্রেডিট গ্রোথ এখন আমাদের অন্যতম প্রধান ইস্যু। গভর্নরও চান ক্রেডিট গ্রোথ বাড়ুক। সেই কারণেই এই প্যাকেজটি আসছে।”
তিনি জানান, এই কর্মসূচির আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থায়নের একটি অংশ দেবে এবং বাকি অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হবে। তবে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকায় অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা গভর্নরকে জানিয়েছি কী পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যেতে পারে। কারণ আমাদের তহবিলের বড় অংশ ইতোমধ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা আছে।”
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ নিয়েও সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, “আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সব ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ‘বাংলা কিউআর’-এর প্রচারণা শুরু করবে। এবিবি এবং সদস্য ব্যাংকগুলো একযোগে বিলবোর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য প্রচারমাধ্যমে বাংলা কিউআরের প্রচারণা চালাবে। একই সঙ্গে সারা দেশে হাজার হাজার কিউআর কোড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তাঁর মতে, এই উদ্যোগ সফল করতে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট, ইস্যুইং ব্যাংক ও অ্যাকোয়ারিং ব্যাংকের চার্জ কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া সভায় দেশীয় কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক 'টাকাপে'-এর সম্প্রসারণ নিয়েও কথা হয়।
এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “টাকাপে ডেবিট কার্ড চালুর পর এখন দ্রুত টাকাপে ক্রেডিট কার্ড চালু করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের নিজস্ব সার্বভৌম ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থা থাকা উচিত। টাকাপে ক্রেডিট কার্ড চালু হলে প্রতিটি লেনদেনে বিদেশি কার্ড নেটওয়ার্ককে ফি দেওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে।”
আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা এবং আমদানি পণ্যের মূল্য যাচাইয়ের বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। মাসরুর আরেফিন বলেন, “ভুল তথ্য সরবরাহ এবং বিলম্বিত তথ্য জমা দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় হিসাব-নিকাশে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি পণ্যের মূল্য নিয়ে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মূল্যতথ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যাংকগুলোর ট্রেড বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে অতিমূল্যায়ন বা আন্ডার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধ করা যায়।”
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল অংশগ্রহণের সুযোগ পুনর্বহালের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “পরিচালকদের বিদেশে অবস্থান, অসুস্থতা বা অন্যান্য বাস্তব কারণে বছরে কয়েকটি সভায় হাইব্রিড অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত বলে ব্যাংকাররা মত দিয়েছেন এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হয়েছে।”
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মাসরুর আরেফিন বলেন, “সংশ্লিষ্ট বিধানটি বাতিলের পথে রয়েছে এবং গভর্নরও প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেছেন। আমরা একটি স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাই। গভর্নরও একই অবস্থানে আছেন।”
তবে রাজনৈতিক চাপে কোনো ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই এবং তিনি মনে করেন না যে বর্তমানে এ ধরনের পরিস্থিতি বিদ্যমান।
ব্যাংকার্স সভা সম্পর্কে সার্বিক মূল্যায়নে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, “বহুদিন পর একটি দুর্দান্ত ব্যাংকার্স সভা হলো। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।”