
দায়িত্বশীল অর্থনীতির মূল্যায়ন শুধু একটি দেশ কত ঋণ নিচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না; নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দায় কমানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিকে সামনে রেখে নতুন ঋণ নেওয়ার তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধকে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় সরকারের এ অবস্থানের কথা জানানো হয়।
জুলাইয়ে নতুন ঋণের চেয়ে ২৭৩ মিলিয়ন ডলার বেশি পরিশোধ
ভিডিওবার্তায় বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ নতুন বৈদেশিক ঋণ হিসেবে পেয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আগে নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ, জুলাইয়ে নতুন করে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ এসেছে, তার চেয়ে ২৭৩ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ডলার বেশি পুরোনো ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে নতুন ঋণের অর্থ ছাড় কমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর অর্থ হলো নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা কমছে এবং আগের দায় পরিশোধে গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
এডিবি, আইডিএ ও জাপান থেকে অর্থছাড়
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভিডিওবার্তায় বলা হয়েছে, জুলাই মাসে এডিবি, আইডিএ এবং জাপান থেকে অর্থছাড় হয়েছে। তবে একই সময়ে কয়েকজন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে অর্থছাড় না এলেও আগের নেওয়া ঋণের দায় পরিশোধের কার্যক্রম থেমে থাকেনি।
সরকার বলছে, এটি কেবল ঋণ পরিশোধের হিসাব নয়; এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি অতীতে নেওয়া দায়ও নিয়মিতভাবে পরিশোধ করছে।
ভিডিওবার্তায় বলা হয়, গত ১৭ বছরের অগণতান্ত্রিক অবৈধ সরকারের সময়ে দ্রুত উন্নয়ন এবং সাময়িক স্বস্তির কথা বলে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে নানা অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ থাকা প্রকল্প, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তি এবং ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পও ছিল।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে যে বোঝা তৈরি হয়েছে, তার বড় একটি অংশের দায় এখনও জনগণকে বহন করতে হচ্ছে বলে ভিডিওবার্তায় উল্লেখ করা হয়।
রিজার্ভ বিপর্যস্ত হওয়ার পর নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
ওই সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বলে ভিডিওবার্তায় বলা হয়েছে। বর্তমান সরকারকে সেই অর্থনৈতিক চাপ সঙ্গে নিয়েই সামনে এগোতে হচ্ছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাই শুধু নতুন ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধের পাশাপাশি অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ভিডিওবার্তায় আরও বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে এই পরিবর্তনের সময় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু সাময়িক চাপ ও অসুবিধা তৈরি হচ্ছে। তবে সাময়িক স্বস্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নতুন ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে চায় না সরকার।
বরং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের ভিত্তি তৈরি করাই লক্ষ্য। ভিডিওবার্তায় বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
এরই মধ্যে রেমিটেন্স, গার্মেন্টস ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি পুরোনো দায় পরিশোধ করা হচ্ছে এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিএনপি সরকার এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। আজকে বহু মানুষ, বহু শিল্পকলকারখানার মালিকসহ সাধারণ বহু মানুষ যে বিদ্যুতের কষ্টে বা জ্বালানি কষ্টে আছেন, তাদের সবার কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণমুক্ত ভিত্তি
ভিডিওবার্তায় বলা হয়, এসব কাজ এগিয়ে নিতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে। কারণ এবার সরকারের লক্ষ্য শুধু লোক দেখানো উন্নয়ন কিংবা সাময়িক স্বস্তি দেওয়া নয়।
সরকারের এবারের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মও ঋণের বোঝায় নত হয়ে থাকবে না। বরং নিজেদের অর্থনীতি, অধিকার ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে—এমন একটি দেশ প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য।
ভিডিওবার্তায় বলা হয়, ইনশাল্লাহ, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।