
নিয়োগ-বাণিজ্যসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে আবারও আলোচনায় এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি। পুনর্গঠনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন ব্যাংকটির কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার।
অভিযোগে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ আলী হোসেন প্রধানিয়া ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল আলম-এর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনই ১২টি অভিযোগে শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর, দুদক চেয়ারম্যানের কাছে এক লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়। শেয়ারহোল্ডার আবু মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, সফিকুল আলম, লকিয়ত উল্লাহ এবং মোহাম্মদ নাজিম সাক্ষরিত অভিযোগ পত্র ঢাকাওয়াচের হাতে এসেছে। তবে শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ আওয়ামীলীগের দোসরদের হাতে একটি সফল ব্যাংক ধ্বংস হতে দেয়া যায় না।
শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার ও কর্মকর্তাদের আশা ছিল, এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরবে। তবে আবেদনকারী শেয়ারহোল্ডারদের দাবি পর্ষদ পুনর্গঠনের পরও ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি, বরং আগের চেয়ে বেশি অনিয়ম ও নিয়োগ বানিজ্য, লুটপাট হয়েছে। জানা যায়, আওয়ামিলীগ আমলের চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালকসহ একটি সিন্ডিকেট বলয় তৈরি হয়েছে।
চার শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ৫ মে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। নিয়ন্ত্রন নিয়ে ব্যাবস্থাপনা পরিচালক সহ কয়েকজন “পরিকল্পিত শূন্যপদ” সৃষ্টি করে ,সেখানে নিয়োগ-বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ। এসময় ১০-২০ লক্ষ টাকা নিচ্ছেন ব্যাবস্থাপনা পরিচালকসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপর সেসব পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে কোম্পানি সেক্রেটারি, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, চিফ রিস্ক অফিসার, চিফ হিউম্যান রিসোর্স অফিসারসহ ৩৮জনকে উচ্চপদে নিয়োগ সম্পন্ন বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে দাবি করেন শেয়ারহোল্ডারগন।
অভিযোগে বলা হয় নিয়োগ পাওয়া একটি অংশ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পূর্ববর্তী কর্মস্থলের ঘনিষ্ঠ বা অনুগত ব্যক্তি। ব্যাবস্থাপনা পরিচালক নিজ প্রভাবে সিন্ডিকেট করে এসব নিয়োগ দিয়েন অর্থের বিনিময়ে। এর ফলে ব্যাংকের কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে অভিযোগের সত্যতার বিষয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ব্যাস্থাপনা পরিচালক টিভিসি ও বিজ্ঞাপন বিল তৈরি করে তার একটি অংশ উপঠৌকন দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে ম্যানেজ করে এমন অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
লিখিত অভিযোগে আরো জানা যায়, ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার (এমটিও) নিয়োগকে কেন্দ্র করে। শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, আগ্রহী প্রার্থীরা সরাসরি চেয়ারম্যান ও এমডির বাসায় এবং দপ্তরে দেখা করলেই তাদের নিয়োগ হয়ে যায়। আর প্রতিকারে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-এর তদন্ত দাবি করেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ২০২৩ সালের বিআরপিডির সার্কুলার নং-১৭ অনুযায়ী ব্যাংকটি বর্তমানে পিসিএর কাঠামোর আওতায় ব্যাংক ক্যাটাগরি-৩ অবস্থানে রয়েছে। এই শ্রেণিতে নতুন নিয়োগ ও ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত নীতি অনুসরণের কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যাপক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।এর ফলে ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটির মুনাফা ৮২০ কোটি টাকা থেকে নেমে ২০২৫ এ ৪৫৭ কোটি টাকায় দাড়িয়েছে। এছাড়াও নারী কর্মীদের শারিরিক ও মানসিক হয়রানির গুরোতর অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকের দায়িত্বরত কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা উপেক্ষা করে বড় পরিসরে নিয়োগ দেওয়া হলে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং মূলধন চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, আরটিজিএস সেবার ফি মওকুফ, বিভিন্ন ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ঘনঘন বোর্ড সভার মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মন্দ ঋণ (এনপিএল) পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে লোকসানি ব্যাংকের পরিনত হওয়ার পথে চলে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক চাপে থাকা কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
এবিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল আলমকে একাধিক ফোন ও টেক্সট করেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনআরবিসি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ঢাকাওয়াচকে বলেন, এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি এই ব্যাংকে তার আত্নীয় স্বজন নিয়োগ দিয়ে এই ব্যাংকে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন। এমনকি তিনি অন্য ব্যাংকের এমডি নিয়োগের ব্যাপারেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের সাথেও সক্ষতা তৈরি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূখপাত্র আরিফ উদ্দিন খান ঢাকাওয়াচকে বলেন, নিয়োগ বা অন্য কোন বিষয়ে ব্যাংকে অনিয়ম সংগঠিত হয় এবং সেই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অভিযোগ পেলে তা আমলে নিয়ে তদন্ত করা হবে। আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ করবে। এবং সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক এটাই করে থাকে। শেয়ারহোল্ডারদের মতে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।