
হাভানা ও ওয়াশিংটন — বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে কাস্ত্রো ভাইদের নাম যুগপৎ একচ্ছত্র আধিপত্য ও বিপ্লবের সমার্থক। তবে বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রো যখন তাঁর চাদর-জাগানো ব্যক্তিত্ব আর অগ্নিবর্ষী বক্তৃতায় কিউবার বিপ্লবকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছিলেন, তখন নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছিলেন অন্য একজন—তিনি রাউল কাস্ত্রো।
পরাশক্তি আমেরিকার ঠিক নাকের ডগায় সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে টিকিয়ে রাখা এবং পরবর্তীতে দেশটির শাসনক্ষমতা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর আনার পেছনে রাউলের ভূমিকা ছিল অনন্য। ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর এবং আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সড়ে দাঁড়ানোর পরও কিউবার রাজনীতিতে রাউল কাস্ত্রোই ছিলেন শেষ কথা।
নেপথ্যের কারিগর থেকে প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রক
১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে রাউল কাস্ত্রো ছিলেন কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। ফিদেল যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঝড়ঝাপ্টা সামলাচ্ছিলেন, রাউল তখন দেশের ভেতরে সামরিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটি নিখুঁতভাবে করছিলেন। ২০০৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাউলের কাঁধে অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব আসে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
 and his brother, politician Raul Castro.webp)
অনেকে মনে করেছিলেন ফিদেলের অনুপস্থিতিতে কিউবার সমাজতান্ত্রিক কাঠামো হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু রাউল অত্যন্ত সুচতুরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে এসে বুঝলেন, বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখতে হলে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বদল আনা জরুরি। তাঁর হাত ধরেই কিউবায় সীমিত পরিসরে বেসরকারি ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়, রিয়েল এস্টেট খাতের দ্বার উন্মোচন হয় এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেলফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থাকা কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
ওবামা প্রশাসন ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সমঝোতা
রাউল কাস্ত্রোর শাসনকালের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে মিলে তিনি ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে দীর্ঘ ৫৩ বছরের বৈরিতার অবসান ঘটানোর ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। এই কূটনৈতিক সফলতার অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে ওবামা হাভানা সফর করেন, যা ছিল বিগত ৮৮ বছরের মধ্যে কোনো দায়িত্বরত মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম কিউবা সফর।
রাউল কাস্ত্রো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেখিয়েছিলেন যে, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে আপস না করেও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসা সম্ভব। তবে পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসে কিউবার ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেই সম্পর্কের গতি আবার থমকে দাঁড়ায়।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ও নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
২০১৮ সালে রাউল কাস্ত্রো রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামী মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হন। তবে পদ ছাড়লেও রাউল কাস্ত্রো ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ ‘কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি’র (PCC) ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
অবশেষে ২০২১ সালের এপ্রিলে, কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম কংগ্রেসে তিনি দলীয় প্রধানের পদ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে কিউবার রাজনীতিতে দীর্ঘ ছয় দশকের ‘কাস্ত্রো যুগ’-এর আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রাউল বলেছিলেন, তিনি দেশের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন, যারা সমাজতন্ত্রের মূল আদর্শ রক্ষা করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
অবসর, বার্ধক্য ও ছায়া-ঐতিহ্য
আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি থেকে দূরে থাকলেও ৯৫ বছর ছুঁইছুঁই এই বর্ষীয়ান নেতা কিউবার রাজনীতিতে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ছায়া হিসেবে থেকে গেছেন। বর্তমান কিউবা যখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও জ্বালানি ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখনো পর্দার আড়ালে যেকোনো বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে রাউল কাস্ত্রোর পরামর্শ ও সম্মতিকেই শেষ কথা বলে গণ্য করা হয়।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফিদেল কাস্ত্রো যদি কিউবান বিপ্লবের ‘হৃদয় ও কণ্ঠস্বর’ হয়ে থাকেন, তবে রাউল কাস্ত্রো ছিলেন সেই বিপ্লবের ‘মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড’। ওয়াশিংটনের চিরন্তন অর্থনৈতিক অবরোধের মুখেও কিউবাকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার পেছনে এই অন্তর্মুখী কিন্তু কঠোর দূরদর্শী শাসকের অবদান কিউবার ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে।
সূত্র: সিএনএন