
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা এ হামলার পেছনে রয়েছে। এ ঘটনায় ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হামলার খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে দরপতন শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইন্যান্স সাময়িকভাবে অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের ক্ষতির সম্পূর্ণ দায় প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে বলে আশ্বাস দেয়। এদিকে টেথার, সার্কেল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের মতো স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, ‘এটি ছিল জটিল একটি হামলা। পরিস্থিতি সমাধানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে। চুরি হওয়া সম্পদের একটি অংশ উদ্ধারে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। আগামী ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলনসেবা আবার চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বাইন্যান্স। তবে বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের সম্পদ কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি।
বাইন্যান্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয় মোকাবিলা এবং গ্রাহকদের সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির এক বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন রিজার্ভ রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ নামে পরিচিত এই তহবিল বিশেষভাবে গ্রাহকদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গঠন করা হয়েছে। বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, চুরির কারণে গ্রাহকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকেও পূরণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেনালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে যেসব বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে এ ঘটনার কৌশলগত সাদৃশ্য রয়েছে।
টিআরএমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের ব্যবহৃত কয়েকটি ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওয়ালেটে পাঠানোর নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইবিটে চালানো হামলার সঙ্গেও এ ঘটনার মিল পাওয়া গেছে। ওই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
টিআরএম তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ হামলায় উত্তর কোরিয়ার বিশেষায়িত হ্যাকার ইউনিটের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তাদের ধারণা। টিআরএম ও চেনালাইসিস—দুটি প্রতিষ্ঠানই হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার ইউনিটের মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তি, অর্থ চুরি এবং রাজস্ব সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তবে পিয়ংইয়ং বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেনেভায় উত্তর কোরিয়ার স্থায়ী মিশন এবং চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ থেকেই জবাব পাওয়া যায়নি।
বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আপনাদের অর্থ নিরাপদ এবং সব ধরনের ক্ষতির দায় আমরা নিচ্ছি। আমাদের তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা যায়নি।’
অন্যদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রেক্ষাপটে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের আরাভিন্দ শ্রীনিবাসন এ ঘটনাকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েনের দাম গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে ইথারের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে পৌঁছায়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
বাইন্যান্সের নিজস্ব ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির দামেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাজার বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট কয়েনগেকোর তথ্য অনুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় টোকেনটির মূল্য ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ ডলার ৭০ সেন্টে নেমে আসে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও দরপতন দেখা যায়।
প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিপ্টো বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনবেস গ্লোবাল জানিয়েছে, বাইন্যান্সের ওপর চালানো এ হামলায় তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, বিটকয়েন কেনার জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্ধিত লেনদেনের সময় প্রায় ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাতের সন্দেহ
বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ ব্যবহার করেই হামলার সূচনা হয়ে থাকতে পারে। ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে হামলাকারীরা বাইন্যান্সের একটি সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার পায় এবং সেখান থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ‘হামলার প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এমন আক্রান্ত কম্পিউটার থেকে পুরো আক্রমণের গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে আমাদের নিরাপত্তা দল।’ পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরও কয়েকটি সম্ভাব্য দুর্বল প্রবেশপথের সন্ধান পাওয়া গেছে।
টোকিওভিত্তিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বিটকয়েন বিনিময় প্রতিষ্ঠান মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের ধারণা, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকতে পারে। প্রায় ১২ বছর আগে ৫০ কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরির ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি ধসে পড়েছিল।
কারপেলেসের মতে, বাইন্যান্স সম্ভবত বিভিন্ন সিস্টেমে নিজেদের সম্পদ ভাগ করে রেখেছিল, যাতে কোনো একটি সিস্টেম আক্রান্ত হলেও সব সম্পদ একসঙ্গে ঝুঁকিতে না পড়ে। কিন্তু এমন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও একটি মাত্র হামলায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারানোর আশঙ্কা পুরোপুরি এড়ানো যায়নি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চুরি হওয়া সম্পদের আর্থিক ক্ষতির বাইরেও এ ঘটনার প্রভাব বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে পুরো ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বেশি থাকা এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে এ খাত।
হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সানের মতে, বাইন্যান্সে এ হামলা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আরও কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো বিনিময় প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সম্পদ জমা রাখার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাইন্যান্সের নিরাপত্তা তহবিলের চেয়েও বেশি সম্পদ চুরি
বাইন্যান্সের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রাহকরা বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেন করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে তাদের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। একই বছর গ্রাহকদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা সম্পদের মোট মূল্য ছিল প্রায় ১৬২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
হামলার পর চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান তৎপরতা শুরু করে। স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে। একইভাবে সার্কেল ৮০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ ফ্রিজ করেছে।
অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদ জব্দ করার উদ্যোগে তারা সম্পদ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিটগোর সহযোগিতা নিয়েছে।
বাইন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়ে হে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোকেন জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করেছে বলে জানান তিনি।
ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে একের পর এক চুরির ঘটনার মধ্যেই সর্বশেষ এ হামলার ঘটনা ঘটল। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় মোট ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্রতিষ্ঠান বিটগেট জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকেও প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থার নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে মুডিস রেটিংসের ডিজিটাল সম্পদ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ানো ভেনট্রিচেল্লি বলেন, বাইন্যান্সের এ ঘটনার প্রভাব সামগ্রিক ঋণব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের ওপর কতটা পড়বে, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। শেষ পর্যন্ত কত সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত দাঁড়াচ্ছে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ফলে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন কিংবা আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ই চূড়ান্ত প্রভাব নির্ধারণ করবে।