
চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে এক টেবিলে বসার আলোচনার মাঝেই ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রস্তাবিত শান্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির কোনো ধারাতেই ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তেহরান যদি কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালায়, তবে তাদের ওপর ‘নরক নেমে আসবে’।
ফ্রান্সে চলমান জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, আলোচনার টেবিলে বহু বিষয় থাকলেও তার কাছে প্রধান অগ্রাধিকার একটাই— ইরান যেন কোনোদিন পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হতে না পারে। তিনি জোরালো দাবি করেন, খসড়া চুক্তির লিখনীতে এই শর্তটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যুক্ত করা হয়েছে এবং এ থেকে ওয়াশিংটন এক চুলও নড়বে না। দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক উদ্বেগের অবসান ঘটাতে এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে শিকল পরানোর চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ের সামরিক সংঘাতের কারণে ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ও সামরিক শক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তার মতে, তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডারও আর আগের অবস্থায় নেই। তবে শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগই শেষ কথা নয়; দীর্ঘ মেয়াদে ইরানের হাত বেঁধে রাখতে আন্তর্জাতিক তদারকি এবং যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেন তিনি।
অবশ্য ইরানের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই দাবি করা হয়েছে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং পরমাণু অস্ত্র বানানোর কোনো অভিপ্রায় তাদের নেই। কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থেই তারা এই কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে দাবি করে আসছে।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবারের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমঝোতার প্রাথমিক খসড়া প্রকাশ করা হতে পারে। এই সমঝোতা স্মারকটি আকারে খুব বড় না হলেও এটি আগামী দিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মূল ভিত্তি বা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রধান প্রধান শর্তগুলোতে দুই পক্ষ একমত হতে পেরেছে এবং বাকি কারিগরি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে বলে ভ্যান্স জানান।
জেডি ভ্যান্স আরও উল্লেখ করেন, চুক্তির শর্ত মেনে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শকদের আবারও ইরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমন্বয়ে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন একটি রূপরেখা তৈরি করা হতে পারে। এর বিনিময়ে ইরান কতটুকু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে, তার ওপর ভিত্তি করে দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
কূটনৈতিক বিভিন্ন সূত্রের খবর, এই সংলাপে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখাকে সম্ভাব্য চুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ ধরা হচ্ছে। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের ধারণা, যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
তবে ট্রাম্প আবারও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আমেরিকা ইরানের পেছনে কোনো অর্থ ঢালবে না এবং যেকোনো ধরণের আর্থিক বা বাণিজ্যিক ছাড় পাওয়া সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ইরানের শর্ত মানার সদিচ্ছার ওপর। একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কাউকে খুঁজে বের করার নামে প্রতিবার আস্ত একটি ভবন ধূলিসাৎ করার কোনো প্রয়োজন নেই। দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সামরিক শক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই কূটনৈতিক দরকষাকষি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি যদি সত্যি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল দুই দেশের সম্পর্কের বরফই গলাবে না, বরং পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে—নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।