
হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে আয়োজিত হাই-প্রোফাইল ইউএফসি (আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ) ইভেন্টকে রক্তাক্ত করার এক ভয়াবহ ও পৈশাচিক নীল নকশা ভেস্তে দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন ও আত্মঘাতী স্নাইপার দল নিয়ে চালানো এই সুগভীর হামলার পরিকল্পনা নস্যাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের চার ভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে পাঁচজন চরমপন্থীকে লোহার গরাদে পুরেছে প্রশাসন।
গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) এক বিবৃতিতে এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানের তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।
সরকারি প্রসিকিউটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘাতক চক্রটির মূল পরিকল্পনা ছিল বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ব্যবহার করে হোয়াইট হাউসের সংলগ্ন ভবনগুলোতে একযোগে বিস্ফোরণ ঘটানো। এরপরের ধাপে ভিআইপি তথা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালানো। আকস্মিক এই হামলায় আতঙ্কিত হয়ে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকবে, তখন তাদের কৌশলে স্নাইপারদের নিশানার মুখে ঠেলে দেওয়ার ছক কষেছিল তারা। শেষ ধাপে হামলাকারীদের আরেকটি সশস্ত্র দল সরাসরি হোয়াইট হাউসের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিয়েছিল।
গ্রেফতার হওয়া এই পাঁচ হামলাকারী হলো—ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ১৯ বছর বয়সী তরুণ টাইসেন সি প্রোপার, ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ব্রায়ান ওমর রোয়া (২৪) ও মাইকেল অ্যালান থমাস (৩২), মিসৌরির ড্যানিয়েল কে এস্ক্রিজ (৩২) এবং নেব্রাস্কার আব্রাহাম হারমোসিলো আলভারেজ (৩১)। আটককৃত এই পাঁচজনের বিরুদ্ধেই মার্কিন আদালতে হত্যার সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে মামলা রুজু করা হয়েছে।
আদালতে পেশ করা চার্জশিট ও আইনি নথি থেকে জানা গেছে, এই ঘাতক চক্রের সম্ভাব্য ‘হিট লিস্ট’ বা লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিলেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং বিশ্বের শীর্ষ ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কসহ বেশ কয়েকজন নির্বাচিত আইনপ্রণেতা। যদিও টার্গেট তালিকায় থাকা এই ভিআইপিদের সবাই ওই দিন ওই ক্রীড়া ইভেন্টে উপস্থিত ছিলেন না।
এফবিআই-এর তদন্তে উঠে এসেছে, এই রক্তক্ষয়ী পরিকল্পনার সুতোটি মূলত উন্মোচিত হয় দলটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য টাইসেন প্রোপারের মাধ্যমে। গত ১০ জুন প্রোপারের মা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফোন করে জানান যে, তার ছেলে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনছে। একই সঙ্গে সে ইন্টারনেটে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও চরমপন্থী একটি খ্রিষ্টান গোষ্ঠীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে—যা একজন মা হিসেবে তাকে চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মায়ের দেওয়া সেই গোপন তথ্যের সূত্র ধরেই তদন্তে নামে এফবিআই।
গোয়েন্দা নথিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের উগ্র ‘দেশপ্রেমিক’ মনে করলেও তাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল যে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ‘ভুল পথে’ এগোচ্ছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে দেশ গঠন করা জরুরি বলে ভাবত তারা। সরকারি উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি, কুখ্যাত এপস্টাইন ফাইলসের আইনি ব্যবস্থাপনা এবং মেগা ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে তৈরি হওয়া স্থানীয় পানি সংকট নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ওপর তাদের চরম ক্ষোভ ছিল।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, অভিযুক্তরা প্রথমে ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটকের ‘ভ্যানগার্ড অব দ্য ওল্ড’ নামক একটি গোপন গ্রুপের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে নিজেদের বিশ্বস্ততা যাচাই-বাছাইয়ের পর তারা উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ ‘সিগন্যাল’-এ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এই হামলার সুনির্দিষ্ট ছক সাজাতে শুরু করে।
বিচার বিভাগের (ডিওজে) দাবি, গ্রেফতারকৃত আব্রাহাম আলভারেজ ছিল এই পুরো অপারেশনের প্রধান মাস্টারমাইন্ড বা সমন্বয়ক। ড্রোনের নিখুঁত উড্ডয়ন ও কারিগরি দিকগুলো দেখভালের দায়িত্বে ছিল সে। তাছাড়া ওয়াশিংটন ডিসির ম্যাপ বা মানচিত্র সংগ্রহ করে সম্ভাব্য স্নাইপারদের অবস্থান, ড্রোন ওড়ানোর নিরাপদ স্পট এবং শহরের মূল বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর কৌশলগত অবস্থান চিহ্নিত করে নিজেদের মধ্যে চালাচালি করেছিল এই চক্রটি।
সাফল্যের সাথে এই মিশন সফল করার পর এফবিআই ডিরেক্টর কাশ প্যাটেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, "অভিযুক্তদের পরিকল্পিত হামলা শুরুর আগেই ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
এদিকে স্পর্শকাতর এই তদন্ত এখনো চলমান থাকায় এই মুহূর্তে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সিক্রেট সার্ভিসের উপপরিচালক ম্যাট কুইন। অন্যদিকে ফ্রান্সে চলমান জি-৭ সম্মেলনে এই বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, "এ বিষয়ে আমি কিছু শুনিনি।"
উল্লেখ্য, গত রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি (সেসকুইচেন্টেনিয়াল) উৎসবের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসের ঐতিহ্যবাহী সাউথ লনে ‘দ্য ক্ল’ নামক একটি বিশালাকার উন্মুক্ত মঞ্চে ইউএফসি-এর এই বিশেষ ফাইটিং ইভেন্টটির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ভিআইপি উপস্থিত ছিলেন এবং হোয়াইট হাউসের চারপাশের রাস্তায় আরও প্রায় ৮৫ হাজার সাধারণ মানুষ অনুষ্ঠানটি উপভোগ করছিলেন।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্তদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আড়াই লাখ ($২,৫০,০০০) ডলার পর্যন্ত বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা হতে পারে। এছাড়া টাইসেন প্রোপারের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউস চত্বরে সশস্ত্র সহিংসতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অতিরিক্ত আরেকটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রাথমিক শুনানি আগামী ২৯ জুন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।