
দেশে উন্নয়ন প্রকল্প, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের নামে ক্রমাগত বনভূমি হ্রাস পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি কার্যকর ‘জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, ব্যাপক হারে বৃক্ষনিধনের ফলে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পরিবেশ অধিদপ্তর মিলনায়তনে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি), গ্রীন ভয়েসসহ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে ‘গাছনিধন মিডিয়া মনিটরিং ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-২০২৬’ প্রকাশ করা হয়।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আরডিআরসির কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল বাবুল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান।
এক নজরে গবেষণা প্রতিবেদন-২০২৬ (মে ২০২৫ - এপ্রিল ২০২৬)
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধ থেকে দেশের বৃক্ষনিধনের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
মোট বৃক্ষনিধন: গত এক বছরে (মে ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬) দেশের গণমাধ্যমগুলোতে মোট ৫২ হাজার ৩৭৫টি বৃক্ষনিধনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
হ্রাসের হার: আশঙ্কাজনক হলেও স্বস্তির বিষয় হলো, এই সংখ্যাটি ২০২৪-২৫ সালের তুলনায় ৭১.২ শতাংশ কম।
শীর্ষ অঞ্চল: জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে রাজশাহীতে (২৩,০৪১টি) এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাছ কাটা হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে (১১,০০০টি)।
পরিবেশের ক্ষতি ও সরকারি উদ্যোগ
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, বৃক্ষনিধনের কারণে মাটিক্ষয়, ভূমিধস ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো পরিবেশগত অবক্ষয় ক্রমে বাড়ছে। বনের আয়তন সংকুচিত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে গাছ কাটার হার কমেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকার বৃক্ষনিধন বন্ধের পাশাপাশি দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক পরিবেশগত অপরাধ দমনে ইউনিয়ন পর্যায়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের গাছ লাগানোর উদ্যোগকে প্রশংসা করে বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, পরিবেশ আদালত আইন কার্যকর করাসহ 'কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে' তাও বিবেচনা করতে হবে।
বৃক্ষনিধন রোধে ৯ দফা সুপারিশ
গবেষকদের পক্ষ থেকে দেশে গাছ কাটা ও বন উজাড় রোধে নয়টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়:
১. বন আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২. একটি আধুনিক ‘জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা।
৩. টেকসই কৃষি ও কৃষিবনায়ন সম্প্রসারণ করা।
৪. নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা।
৫. দেশব্যাপী ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ।
৬. প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা।
৭. বনের ওপর আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা।
৮. বন-নির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৯. পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
উল্লেখ্য, আরডিআরসি ২০২৩ সাল থেকে দেশে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের চিত্র তুলে ধরতে ধারাবাহিক গবেষণা ও মিডিয়া মনিটরিং রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। এবারের অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের মিহির বিশ্বাস, গ্রিন সেভারসের এহসান রনিসহ অন্যান্য জলবায়ু গবেষক ও পরিবেশ কর্মীরা।