
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল জনগণের যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম—এমন মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
শুক্রবার ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেসের ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরতে আগ্রহী ছিলেন না। ফলে যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনা, মানুষের ত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো ইতিহাসে যথাযথভাবে স্থান পায়নি। এসব ঘটনা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সম-অধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন সম্পর্কে জানার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তা সংশোধন করবে। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের রায়কে সম্মান করেনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিলেও সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়। পরে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা ও ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে কার্যকর দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ যখন সীমিত হয়ে পড়ে, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।
তার ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অল্পসংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক যুদ্ধে যোগ দেন।
তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছায়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও কর্মকর্তারাই এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। এই ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।
বক্তব্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও অবদানের কথাও তুলে ধরেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত কোনো কৃতিত্বের জন্য যুদ্ধে অংশ নেননি। দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্যই তারা অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা নিয়ে যে ধারণা পোষণ করত, ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তা ভুল প্রমাণ করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধান সেনাপতির নির্দেশে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য তিনি বিভিন্ন ইয়্যুথ ক্যাম্প থেকে তরুণদের নিয়োগ করেছিলেন। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী দেশের জন্য যুদ্ধ করার অপেক্ষায় ছিল। কঠিন জীবন, অপ্রতুল খাবার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও তারা যুদ্ধে যাওয়ার এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণে গিয়ে কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধের বীরত্বের কথা বললে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকরাও বিস্মিত হতেন। তাদের মন্তব্য ছিল, এমন আক্রমণ কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব নয়; যারা দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, তারাই এমন সাহস দেখাতে পারে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষের গণঅভ্যুত্থানও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, চারবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন। পাক বাহিনী তাকে ঢাকায় খুঁজে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেফতার করেছিল।
এ সময় নিজের প্রয়াত স্ত্রী দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠার প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭২ সালে দেশের সেনাবাহিনী ছিল ছোট। তবে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।