
ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। তবে এই অধিকারকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিকৃত করা হলে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ কারণে বাংলাদেশে জাল ভোটকে গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যের পরিচয়ে ভোট দেওয়া, ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার, জাল ভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা এসব কাজে সহযোগিতা—সবই আইনের চোখে অপরাধ। প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
নির্বাচনী অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে জাল ভোট কেবল অনৈতিক আচরণ নয়, বরং আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ—যার পরিণতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।
জাল ভোট বলতে কী বোঝায়?
জাল ভোট হলো এমন ভোট, যা প্রকৃত ভোটার নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় দেননি বা দিতে পারেননি। এর মধ্যে পড়ে—কোনো ব্যক্তি অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে ভোট দেওয়া, ভোটার উপস্থিত না থাকলেও ব্যালট বা ইভিএমে ভোট পড়ে যাওয়া, ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা কিংবা একজনের একাধিকবার ভোট প্রদান। অর্থাৎ যেখানে ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত মতপ্রকাশ অনুপস্থিত, সেখানেই জাল ভোটের ঘটনা ঘটে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জাল ভোটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, জাল ভোট প্রতিরোধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে তারা। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক মামলা, গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কমিশন স্পষ্ট করেছে।
আইন ও শাস্তির বিধান
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ৭৩ থেকে ৮৭ অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্রে বেআইনি আচরণ ও নির্বাচনী অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ আছে। ভোটগ্রহণ চলাকালে দায়িত্বরত নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় শাস্তি নিশ্চিত করবেন।
যেসব কাজ জাল ভোট হিসেবে গণ্য
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া বা তাকে প্ররোচিত করা শাস্তিযোগ্য।
এছাড়া—
ভোট দেওয়ার অযোগ্য জেনেও ভোট প্রদান বা ব্যালট পেপার চাওয়া;
একই কেন্দ্রে একাধিকবার ভোট দেওয়া বা ব্যালট চাওয়া;
একই নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রে ভোট প্রদান;
ভোট চলাকালে কোনো কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার সরিয়ে ফেলা;
জ্ঞাতসারে এসব কাজে কাউকে প্ররোচিত করা বা সহায়তা চাওয়া—সবই জাল ভোটের আওতায় পড়ে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন জাল ভোট প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে।