
জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাণিজ্য ও শিল্প এবং বস্ত্র ওপাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও দ্রুত করতে হবে। একই সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) দ্রুত স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু। এতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান অংশ নেন।
সভায় জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইয়ার্ড আধুনিকায়ন, পরিবেশগত মান পরিপালন এবং অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ গুরুত্ব পায় চট্টগ্রাম থেকেই সংশ্লিষ্ট ছাড়পত্র ও ফাইল অনুমোদনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের ক্রয়াদেশ পেতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। জাহাজ নির্মাণে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর নীতিমালা মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে দেশের প্রক্রিয়াগুলো সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নিয়মকানুন ও প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে তাঁর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (বিডা)।
কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগ ও পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। যেসব নিয়ম বাস্তবায়ন করা যায় না, সেগুলো একসময় কার্যকারিতা হারায়। এ জন্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে কাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি।
জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অর্থায়ন ও আটকে থাকা ঋণের জটিলতা নিয়েও কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরোনো ঋণের জটিলতায় দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে বর্তমান সংকট কাটিয়ে খাতটিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে হবে। উদ্যোক্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক ও সমন্বিত উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
সভায় পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, টিএসডিএফ না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে দ্বিধা করছে এবং বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে। ফলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় জাহাজে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থাকে। এসব জাহাজ আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে শিল্পটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন তিনি।
দেশের আবাসন ও রি-রোলিং শিল্পে কাঁচামাল এবং স্ক্র্যাপের চাহিদার কথা তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন পরিপালন ও শিল্পের কার্যক্রম সচল রাখার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
সভায় কার্যপত্র উপস্থাপন করেন শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি জানান, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম গতিশীল করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফর্মের ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ শুরু করেছে। হংকং কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রিন ইয়ার্ড নির্মাণের নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও কাজ চলছে।
ছাড়পত্র পেতে ৪৫ থেকে ৬০ দিনের বিলম্ব এড়াতে চট্টগ্রাম থেকেই সংশ্লিষ্ট ফাইল অনুমোদনের ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সময় কমানো এবং শিল্পের কার্যক্রম সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরো বলেন, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ খাতকে পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি বা অস্পষ্টতা থাকলে একটি জাতীয় সনদের মাধ্যমে তা সমাধানের কথাও জানান তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করে সম্ভাবনাময় এ খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা হবে না। টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি,অর্থ সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও আইন ও সংসদ বিষয়ক সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।