
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে প্রতিদিন নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ধারাবাহিক হামলার ফলে ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়, বিশ্বের বৃহত্তম তেলসমৃদ্ধ এসব দেশের প্রধান জ্বালানি সরবরাহের পথ- হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় আরও ঘনীভূত হয়েছে সংকট। এ যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশেও এ যুদ্ধের প্রভাব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ লাইন, কোনো কোনো জেলায় সবগুলো জ্বালানিকেন্দ্রই শূন্য। কিন্তু এসব সংকট ছাপিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে ফসলের সেচ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি, কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে এই জ্বালানি ঘাটতি ক্রমবর্ধমান হারে চাষাবাদের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বোরো ধান চাষ করা এবং সেচ কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তুলনামূলক বেশি আর্দ্র এবং জলমগ্ন ভূমিতে এ ধানের চাষ হয়, পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকেরা ডিজেল চালিত মেশিনের মাধ্যমে ক্ষেতে সেচ প্রদান করে। ডিজেলের পর্যাপ্ত যোগান না থাকায় উদ্বিগ্ন দেশের কৃষকেরা।
সরেজমিনের চিত্র
লনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের জালিয়ারডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান গাজী এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। কয়েক দিন আগে বৃষ্টিতে জমিতে কিছু পানি জমলেও গত দুই দিনে তা শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে পাশের ঘের থেকে পানি তুলতে পারছেন না তিনি—কারণ কোথাও জ্বালানি তেল মিলছে না।
তিনি বলেন, “পাশের একটি পেট্রল পাম্পে কয়েকবার গেলেও সেখানে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখন সেচ দিতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। ঠিকমতো পানি না পেলে ধানগাছ শুকিয়ে যাবে, থোড় বের হবে না, পোকা লাগার আশঙ্কাও আছে। ফলে ১০০ মণ ধান থেকে কমে ৪৫-৫০ মণ হবে, উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে।”
নিজের জমির সম্ভাব্য উৎপাদনের হিসাব তুলে ধরে তিনি জানান, সাধারণত তার জমিতে ৪৫-৫০ মণ হারে প্রায় ১০০ মণ ধান হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কমে ৪০-৫০ মণে নেমে আসতে পারে।
খুলনা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে বুধবার সকালে তাকে দেখা যায়, পাম্পের বদলে হাতে পানি ছড়িয়ে জমিতে আর্দ্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
এই অঞ্চলের আরো একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বোরো চাষাবাদের জন্য প্রতি পাঁচ দিন অন্তর সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রায় তিন লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু গত ১০-১২ দিন ধরে কোথাও তেল পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে তারা স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের শলুয়া গ্রামের বাসিন্দা দীপক দাশ জানান, তার মুরগির খামার ও সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হলেও গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও কোথাও তেল পাননি।
খুলনার চারটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও খোলা বাজারে তেল বিক্রি হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ডুমুরিয়া উপজেলার খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশের একটি ফিলিং স্টেশন গ্রাহকদের প্রবেশ ঠেকাতে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে টানানো নোটিশে লেখা—“তেল নাই”। কর্মচারীরা জানান, সরবরাহ এলেই পাম্প চালু করা হবে।
অন্যদিকে, খুলনা শহরের জয় বাংলা মোড় এলাকায় মারিয়া ফিলিং স্টেশনে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অকটেন নিতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে।
স্টেশনটির মালিক শেখ মিজানুর রহমান বলেন, “আজ বুধবার মাত্র ২ হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি। তা দিয়েই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। গতকাল ডিপো থেকে কোনো অকটেন পাইনি। এ মাসে আমার ফিলিং স্টেশনের জন্য মাত্র ৩ হাজার লিটার পেট্রল পেয়েছি।”
তিনি জানান, বর্তমানে প্রাইভেটকারে ১০ লিটার, পাজেরো গাড়িতে ২০ লিটার এবং মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ সময়ে তার স্টেশনে দৈনিক ২৫০০ থেকে ২৬০০ লিটার অকটেন বিক্রি হলেও ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বাড়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
খুলনা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৯ হেক্টর, তবে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯৩ হেক্টর—যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
খুলনা কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে বোরো ধান বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ জমিতে ধান চারা থেকে ছড়া তৈরির পর্যায়ে, মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে ধান হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।” তার দাবি, বোরো চাষে বড় ধরনের সমস্যা হবে না এবং ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
অন্যদিকে, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০ মার্চ অকটেন সরবরাহ করা হয় ৪৫ হাজার ৫০০ লিটার, পেট্রোল ১ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ লিটার এবং ডিজেল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৭০০ লিটার। ২৩ মার্চ সরবরাহ করা হয় ৫৬ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন, ১ লাখ ৫৯ হাজার লিটার পেট্রোল এবং ৬ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল।
প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশনস) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। আমরা চাহিদা বিবেচনা করে তেল সরবরাহ করছি। অতিরিক্ত তেল নিয়ে যেন কেউ সিন্ডিকেট করতে না পারে, সেদিকেও আমরা নজর রাখছি।”