
বাংলার গ্রামীণ জীবনে একসময় জলাশয়, খালবিল, রাস্তার ধারে আর আঙিনার কোণে যে অসংখ্য দেশীয় শাক স্বাভাবিকভাবে জন্মাত, সেগুলোর বড় অংশ এখন দৃশ্যত হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশে পরিবর্তন, বাণিজ্যিক চাষাবাদের চাপ, জলাশয় ভরাট এবং রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এসব পুষ্টিকর শাক এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। ফলে গ্রামের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো যেসব খাদ্যের ওপর একসময় নির্ভর করত বিনামূল্যে, তা এখন বাজারনির্ভর হয়ে পড়ছে, বাড়ছে দৈনন্দিন ব্যয়।
গ্রামীণ মানুষদের মতে, একসময় বেতো শাক, হেলেঞ্চা শাক, কলমি শাক, গিমে শাক, থানকুনি, নটে শাক, ঢেঁকি শাক, তেলাকুচা পাতা, পুনর্ণবা, পিঁড়িং, আমরুলী, গিমা শাক, পুঁই শাক এবং ঘেটকুল শাক ছিল প্রায় ঘরের আশেপাশেই পাওয়া যেত। এগুলো শুধু খাবার নয়, অনেক ক্ষেত্রে ঘরোয়া ভেষজ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন অনেক এলাকাতেই এসব শাক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ বলছে, জলাশয় ভরাট, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং আগাছা দমনে অতিরিক্ত পরিষ্কারকরণ কার্যক্রম এসব শাকের প্রাকৃতিক জন্মস্থল নষ্ট করে দিচ্ছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যেও প্রভাব পড়ছে, কারণ এই শাকগুলো শুধু খাদ্য নয়, মাটির উর্বরতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখত।
গ্রামীণ এক বাসিন্দা বলেন, ‘আগে বাড়ির পাশের খালপাড়ে হেলেঞ্চা আর কলমি শাক এমনিতেই উঠত। এখন বাজার থেকে কিনতে হয়, তাও সব সময় পাওয়া যায় না।’ আরেকজন জানান, ‘যে জিনিস আগে বিনা খরচে পাওয়া যেত, এখন সেটাই পরিবারের খাবার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দেশীয় শাকগুলো ছিল দরিদ্র মানুষের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক পুষ্টি ভাণ্ডার। এগুলোতে আয়রন, ভিটামিনসহ নানা পুষ্টিগুণ থাকায় অপুষ্টি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎস সংকুচিত হওয়ায় এখন অনেক পরিবারই সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, পুরো গ্রামীণ বাস্তুতন্ত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। শাকগুলো হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষুদ্র প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আবাসও সংকুচিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গ্রামবাংলার এই নীরব পরিবর্তনে তাই একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতি, অন্যদিকে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ। সহজলভ্য সবুজের জায়গা দখল করছে বাজারের ব্যয়বহুল খাদ্য, আর সেই পরিবর্তনের ভার সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর।