
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদে দায়িত্ব পালন করা ওবায়দুল কাদের এখন দলের কেন্দ্রীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দলের ভেতরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের অধ্যায় কি তবে শেষের পথে?
এক সময় ওবায়দুল কাদেরের দৈনন্দিন রাজনৈতিক বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন এবং নাটকীয় মন্তব্য ছিল দেশের গণমাধ্যমের প্রধান আকর্ষণ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত ও যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় একবারে প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা ও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যোগাযোগের মাধ্যমে দল পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কোনো সম্পৃক্ততা বা দৃশ্যমান ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দলের আগামী দিনের নেতৃত্বের জন্য এমন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে প্রয়াত জিল্লুর রহমান বা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, ভদ্রতা ও কঠিন সংকট মোকাবিলায় দলের ভেতরে ঐক্য বজায় রাখার সাংগঠনিক সক্ষমতা রয়েছে। এই মানদণ্ডে ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
দলীয় বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, বর্তমানে ওবায়দুল কাদের তাঁর স্ত্রী ইসরাতুন্নেসা কাদেরকে নিয়ে ভারতের কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় অবস্থান করছেন। এক সময় শত শত নেতাকর্মী বেষ্টিত থাকা এই হেভিওয়েট নেতা এখন চরম নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতার বাইরে কেন্দ্রীয় বা জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউই তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখছেন না। এমনকি কলকাতার হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসাধীন থাকার খবর এলেও কেন্দ্রীয় দলীয় কার্যক্রমে বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তাঁকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতার মধ্যেই ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে।
নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ: তিনি দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের পাশ কাটিয়ে বিতর্কিত এবং সুবিধাবাদীদের দলে জায়গা দিয়েছেন।
দলের উপকমিটিগুলোর পদ বণ্টন, ব্যক্তিগত প্রচারসর্বস্ব রাজনীতি এবং চাটুকারিতার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়ায় দলের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তাঁর কিছু আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বক্তব্য ও ছাত্রলীগকে দেওয়া নির্দেশনা পরিস্থিতিকে আরও সহিংস ও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলেছিল বলে মনে করেন দলের একাংশের নেতারা।
এক বছর আগে দিল্লিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ থাকলেও তিনি তাতে অংশ নেননি, যা দলের ভেতরে তাঁর এক ধরনের অভিমান বা দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া রাজনৈতিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। এর পাশাপাশি দেশে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং দুর্নীতির অভিযোগে শতাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী এই সাধারণ সম্পাদকের অধ্যায় কার্যত শেষের দিকে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও দলের নীতিনির্ধারকেরা।