
নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও বীরত্বগাথা ছড়িয়ে দিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ২০২৮ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জীবন, কর্ম, শাহাদাত এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনাবলী অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির দুজন সদস্যের সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক দুটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধের আলোকে নতুন পাঠ প্রস্তুত করা হবে।
পাঠ্যবইয়ে যেভাবে স্থান পাবেন ওসমান হাদি
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশজুড়ে চালু হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাক্রমে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির অকুতোভয় যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদির বীরত্বপূর্ণ অবদান শিক্ষার্থীদের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
সভা সূত্র আরও জানায়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি বিশেষ বিন্যাসে এই পাঠ যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ অধ্যায়ে বাঁশের কেল্লাখ্যাত তিতুমীর, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নূর হোসেন এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধকে যেভাবে বীরত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে, ঠিক একই আদলে শরিফ ওসমান বিন হাদিকেও নতুন পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের পটভূমি
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের সামগ্রিক শিক্ষাক্রম পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছিল এবং ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবইয়ে বিভিন্ন পরিমার্জন আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সরকার গঠনের পর, আগামী ২০২৮ সাল থেকে একটি সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
শহীদ ওসমান হাদির সংক্ষিপ্ত জীবন ও শাহাদাত
তরুণ এই নেতার জীবন ও তাঁর ওপর হওয়া বর্বরোচিত হামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
পরিচয় ও শিক্ষা: ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সন্তান শরিফ ওসমান হাদির বাবা একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। ওসমান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পূর্বে নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
আন্দোলন ও নেতৃত্ব: জুলাই অভ্যুত্থানে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
বর্বরোচিত হামলা ও মৃত্যু: গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে একদল দুর্বৃত্ত তরুণ এই নেতার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। গুরুতর আহতাবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর বিমান অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই রেভোলিউশনারি নেতা। অবসান ঘটে এক সম্ভাবনাময় তরুণ নেতৃত্বের।