
রমজানের প্রথম দিনেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে বসেছে ইফতারির মহা মেলা। শতাব্দীপ্রাচীন এই বাজারে রোজাদারদের ভিড়ে জমে উঠেছে বিকিকিনি, আর হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে চকবাজারের সার্কুলার রোডে দেখা যায়, জোহরের নামাজের পরপরই দোকানিরা ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন। দুপুর গড়াতেই ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ইফতারের সময় যত ঘনিয়ে আসে, ততই বাড়ে মানুষের ঢল।
প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এ বাজার রমজান এলেই হয়ে ওঠে রোজাদারদের অন্যতম গন্তব্য। সাধারণত পাড়া-মহল্লায় ছোলা, আলুর চপ, বেগুনি ও পেঁয়াজু ইফতারের নিয়মিত উপকরণ হিসেবে বিক্রি হলেও চকবাজারের বৈচিত্র্য একেবারেই আলাদা। এখানে প্রায় ১০০ ধরনের ইফতারি আইটেম পাওয়া যায়। বিশেষ আকর্ষণ ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।
খাসির পা থেকে শুরু করে নানা রকম মুখরোচক খাবারে সাজানো দোকানগুলো। এর মধ্যে চিকেন আচারি ১২০ টাকা, শাহী রুটি ৮০-১০০ টাকা, দই বড়া ৫ পিস ২০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৮০ টাকা, চিকেন স্টেক ৮০ টাকা, চিকেন লেগপিস ৮০ টাকা, তান্দুরি চিকেন ১০০ টাকা, চিকেন বল ৬০ টাকা, চিকেন বান ৪০ টাকা, শর্মা ৪০ টাকা, চিকেন টোস্ট ৬০ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা, শাহী পরোটা ৬০-৮০ টাকা, খাসির লেগপিস ৯০০ টাকা, কোয়েল পাখি পিস ৯০ টাকা, টিকা ১০-৩০ টাকা, সমুচা ২০ টাকা, সুতি কাবাব কেজি ১৬০০ টাকা, নিমকি ২০ টাকা এবং শাহী জিলাপি কেজি ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছোলা, মুড়ি, আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু ও ঘুঘনি ৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
চকবাজারের ইফতারি বাজারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘বড় বাপের পোলায় খায়’, যার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। দোকানের সামনে দাঁড়ালেই শোনা যায় সেই পরিচিত ছন্দ, ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’, ‘ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’।
এই বিশেষ খাবারটি তৈরি করা হয় মাংস, কাবাব, ডিম, ঘি, বুটের ডাল, মাংসের কিমা ও নানা ধরনের মসল্লা দিয়ে। স্বাদের বৈচিত্র্যের কারণে রোজাদারদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে এটি।
বিক্রেতা মোহাম্মদ বলেন, “বড় বাপের পোলায় খায় চকবাজারের জনপ্রিয় ইফতারি আইটেম। ঢাকার নানান জায়গা থেকে মানুষ এই খাবার কিনতে চকবাজারে আসেন। ১২ রকমের আইটেম ও মসল্লাসহ এইটা তৈরি করা হয়। গতবছরের মতো এবারেও প্রতি কেজি ৮০০ টাকাতে বিক্রি হচ্ছে।”
আরেক বিক্রেতা মোশাররফ বলেন, “এবারে রোজার প্রথম দিনেই বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে। আশা করছি এমনই থাকবে। আর আমরাও মানসম্মত ইফতারি বিক্রি করার চেষ্টা করে থাকি।”
চকবাজারের অধিকাংশ বিক্রেতাই বংশপরম্পরায় এখানে ব্যবসা করে আসছেন। তবে তাদের সঙ্গে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও যুক্ত হন, যারা শুধুমাত্র রমজান মাসে ইফতারি বিক্রি করেন। শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দাই নন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এখানে আসেন ইফতারির স্বাদ নিতে।
মগবাজার থেকে আসা ক্রেতা মো. শামীম বলেন, “প্রতি বছর রোজা এলে চকবাজার থেকে ইফতার কিনে থাকি। আজ প্রথম রোজা, ভাবলাম এখান থেকেই আজ ইফতার কিনি, তাই এলাম।”
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা তাহেরুল বলেন, “চকবাজারের মূলত আসা হয় বিভিন্ন রকম মুখরোচক ইফতারি আইটেমের জন্য, যা হয়তো সচরাচর অন্যান্য জায়গায় পাওয়া যায় না। তব বেশিরভাগ ইফতার খোলা রেখে বিক্রি করা হয়, এ বিষয়ে বিক্রেতাদের সচেতন হওয়া উচিত।”