
বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আগামী বছর সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে—এমন পূর্বাভাসের মধ্যেই জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর তাদের বাজেট ১৬ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির অনুমোদিত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কমানো হচ্ছে। নতুন আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতেই ইউএনএইচসিআর এই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে কূটনীতিক ও সংস্থাটির বাজেটসংক্রান্ত নথি থেকে জানা গেছে।
নথির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৭ সালে ইউএনএইচসিআরের অনুমোদিত কর্মীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। একই সময়ে সংস্থাটির বাজেট কমবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনসহ বিভিন্ন দেশের বিদেশি সহায়তার বাজেট কমানোর যে প্রভাব পড়েছে, তার সামগ্রিক চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে।
ইউএনএইচসিআরের বাজেটসংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সংস্থাটির অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১২৬টি। চলতি বছর তা কমে হয়েছে ১২ হাজার ৫১টি। ২০২৭ সালে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫৪০টিতে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব হিসাবের মধ্যে অস্থায়ী কর্মী ও ঠিকাদারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় জাতিসংঘের এক বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সামনে ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তারা সর্বশেষ বাজেট কাটছাঁটের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। বৈঠকে উপস্থিত তিন কূটনীতিক বিষয়টি জানিয়েছেন।
তবে ইউএনএইচসিআরের এক মুখপাত্র বলেছেন, নথিতে যে বড় ধরনের কাটছাঁটের হিসাব দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে সেটি পুরোপুরি কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ আগের বাজেটগুলোতে অনেক পদ অনুমোদিত থাকলেও সেগুলো কখনো পূরণ করা হয়নি। এসব বাজেট বাস্তবে পাওয়া অনুদানের ওপর নয়, বরং প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য অর্থায়নের লক্ষ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল।
বাজেটের সীমাবদ্ধতা বাস্তব
ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বলেন, আগামী বছরের জন্য সংস্থাটির আয়ের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা ২০২৬ সালের পূর্বাভাসের মতোই। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে সংস্থাটি বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছিল। এর ফলে কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হয়েছিল।’
তিনি আরও জানান, সংস্থাটি এমন কিছু ‘অযৌক্তিক’ নীতির সংস্কার করবে, যার কারণে সর্বোচ্চ ১ হাজার কর্মীকে একটি দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় চাকরিতে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
মুখপাত্র বলেন, ‘বাজেটের সীমাবদ্ধতা বাস্তব। তবে ইউএনএইচসিআরকে আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং জবাবদিহিমূলক করে তুলতে আমরা একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচিও এগিয়ে নিচ্ছি।’
দাতাদের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় ইউএনএইচসিআর বিশেষভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে শরণার্থীদের জন্য সহায়তা কমানো, হাজার হাজার চাকরি বাতিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলের একটি কার্যালয় বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে জেনেভায় অবস্থিত ইউএনএইচসিআরের সদর দপ্তরও শহরের তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল একটি ভবনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধ, নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে ইউএনএইচসিআর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সংস্থাটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। এর বড় একটি অংশ দাতারা আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করে দেন। রাজনৈতিকভাবে পছন্দের প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার এই ব্যবস্থা বর্তমানে অনেকের কাছে সংস্থাটির একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এমন সময়ে ইউএনএইচসিআরের বাজেট সংকোচনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন সংস্থাটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার বারহাম সালেহ পরে আশা প্রকাশ করেছেন যে এই অংশীদারত্ব অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অন্যান্য দেশকেও আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি প্রচারে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউএনএইচসিআর তাদের বাজেট নথিতে জানিয়েছে, আগামী সময়ে জরুরি পরিস্থিতিতে শরণার্থীদের সহায়তা দেওয়া, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা এবং শরণার্থীদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সহায়তা করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আমেরিকা অঞ্চলে সবচেয়ে বড় কাটছাঁট
বাজেটসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জন্য ইউএনএইচসিআরের প্রস্তাবিত বাজেট ৭ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের তুলনায় এই বাজেট ১৬ শতাংশ কম। অন্তত গত ১০ বছরের মধ্যে এটি সংস্থাটির সবচেয়ে ছোট বাজেট। ২০২৫ সালে ইউএনএইচসিআরের বাজেট ছিল ১০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে সংস্থাটির বাজেটকে উচ্চাভিলাষী হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি খুব কম ক্ষেত্রেই পুরোপুরি অর্থায়ন পায়।
২০২৫ সালে ইউএনএইচসিআরের সবচেয়ে বড় দাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সংস্থাটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছিল। এটি ইউএনএইচসিআরের মোট ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
সব অঞ্চলের জন্যই ইউএনএইচসিআরের বাজেট কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁটের মুখে পড়বে আমেরিকা অঞ্চল। সেখানে বাজেট প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৪৮৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানোর কথা।
এর পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক এবং পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাজেট ২২ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই অঞ্চলে বাংলাদেশে থাকা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ইতোমধ্যেই আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার বাজেট কমবে ২১ শতাংশ। এই অঞ্চলে সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।
আশ্রয়দাতা দেশগুলোও উদ্বিগ্ন
ইউএনএইচসিআরের বাজেট কমানোর পরিকল্পনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৭ সালে বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ১৩ কোটি ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে। চলতি বছর এই সংখ্যা ১২ কোটি ৯৪ লাখ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেন ও সুদানের মতো দেশে চলমান সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ইউএনএইচসিআরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত কূটনীতিকরা এই পূর্বাভাসের তথ্য জানিয়েছেন।
বৈঠকে কয়েকটি দেশ শরণার্থীদের ওপর বাজেট কাটছাঁটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে উগান্ডা ও বাংলাদেশের মতো বড় শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশগুলো কীভাবে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে কূটনীতিকরা জানিয়েছেন।
এক কূটনীতিক বলেন, ‘সবাই বিরক্ত। কিন্তু যে ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে, সেটাকেই পুরোপুরি ভেঙে ফেলা আরও খারাপ হবে।’
তবে কয়েকজন কূটনীতিক বলেছেন, কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও সহজ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।
২০২৭ সালের এই বাজেট এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অক্টোবরে ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী কমিটির অনুমোদনের পর বাজেটটি চূড়ান্ত হবে।