
দেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি, যা ব্যয় বৃদ্ধির চাপ ও রপ্তানিতে হ্রাসসহ অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এবং আরও অনেকের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংকটের মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের একার পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। তাই সরকারের আর্থিক সহায়তা জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, বিজিএমইএ-এর একটি প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে পোশাক শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে রপ্তানি সচল রাখতে সরকারের নীতিগত ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের আবেদন জানান বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান এবং পরিচালক ফয়সাল সামাদ।
বৈঠকে তারা জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২.৪৩% হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৯.৪৩% কমে গেছে।
বিজিএমইএ নেতারা আরও জানান, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের দাম কমে যাওয়া এবং অর্ডারের হ্রাসের কারণে গত এক বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, এবং আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার মুখে।
তাদের মতে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, সরকারি ছুটি ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কার্যদিবস কমে যাবে। ৬০ দিনের মধ্যে কারখানা মাত্র ৩৫ দিন খোলা থাকলেও, মার্চে নিয়মিত বেতন, বোনাস ও অগ্রিম মিলিয়ে কারখানাগুলোকে প্রায় দ্বিগুণ মজুরি পরিশোধ করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে। যথাসময়ে ব্যাংকিং সহায়তা না পেলে শ্রমিকদের মজুরি ও উৎসব ভাতা প্রদানের পাশাপাশি উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে না, যা শিল্প ও অর্থনীতির জন্য অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিজিএমইএ প্রতিনিধি দল বৈঠকে সরকারের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করেন। প্রথমত, লিয়েন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রক্রিয়াধীন থাকা বকেয়া নগদ সহায়তার আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি ও অর্থ ছাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান। এতে কারখানাগুলোর ক্যাশ-ফ্লো স্বাভাবিক হবে। দ্বিতীয়ত, আসন্ন ঈদ ও নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও বোনাস নিশ্চিত করতে ছয় মাসের সমপরিমাণ অর্থ ‘সফট লোন’ বা স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ আকারে প্রদানসহ অন্যান্য জরুরি সহায়তা।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অর্থ সচিব প্রস্তাবসমূহ গুরুত্বসহকারে শোনেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।