
বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও আর্থিক দিক থেকে টেকসই করে তুলতে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়ার নজিরবিহীন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে আগ্রহী বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিতরণ সংস্থা পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য খোলা আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত ‘এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।
জ্বালানিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক নীতিনির্ধারণ করা। তবে খুচরা পর্যায়ে সাধারণ গ্রাহকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি বেসরকারি খাতের অধীনে পরিচালিত হলেই তা বেশি ফলপ্রসূ ও কার্যকর রূপ নেবে। তিনি জানান, বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তরের এই প্রস্তাবনায় ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিলছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের দৃষ্টান্ত টেনে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, কলকাতা, মুম্বাই ও দিল্লির মতো ব্যস্ত মেগাসিটিগুলোতে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম সাফল্যের সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই সামলাচ্ছে। বাংলাদেশের স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারাও একইভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলে বিশ্বাস ব্যক্ত করে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বিবেচনাধীন এই ব্যবস্থার সুফল তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বণ্টন ব্যবস্থা বেসরকারি হাতে স্থানান্তরিত হলে বকেয়া বিল আদায়ের গতি বাড়বে, গ্রাহকসেবার গুণগত মান নিশ্চিত হবে এবং জাতীয় কোষাগারের ওপর থাকা আর্থিক বোঝা বহুলাংশে লাঘব হবে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি তেল বা পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির উদ্দেশ্যে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বাজার চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ কমবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই দেশে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও তুলে ধরেন যে, বাণিজ্যিক ও বেসরকারি বিনিয়োগে ক্লাস্টারভিত্তিক ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। এই বাণিজ্যিক মডেলে বিনিয়োগকারীরাই ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বসানো ও তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন এবং ‘নেট-মিটারিং’ পদ্ধতিতে সরাসরি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ উসূল করবেন।
পরিকল্পনায় বিশেষ প্রণোদনা ও কড়াকড়ির বিষয়টি এনে মন্ত্রী বলেন, যেসব ভবনে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু থাকবে, সেগুলোর মালিকদের জন্য সিটি করপোরেশন বা পৌরকর (মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স) ছাড়ের সুবিধা প্রদান করা হবে। অপরদিকে, সরকারি এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে যারা সাড়া দেবেন না, তাদের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স ধার্যের বিষয়টিতেও সরকার নজর রাখছে।
এছাড়া বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা হয়ে গেছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী আগস্ট অথবা সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এসব প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে। তিনি আরও যোগ করেন, দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের জন্য চীনা বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যেই যথেষ্ট উৎসাহ ও আগ্রহ দেখিয়েছেন।